শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ‘গোলবন্যা’র কারণ জানা গেল

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ‘গোলবন্যা’র কারণ জানা গেল

বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেকেই ‘সান্ত্বনার লড়াই’ বলে থাকেন। কিন্তু মাঠের চিত্র প্রায়ই বলে ভিন্ন কথা। ফাইনালের আগের দিনের এই ম্যাচে বারবার দেখা যায় খোলামেলা ফুটবল, পাল্টাপাল্টি আক্রমণ আর গোলের ছড়াছড়ি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয়।

২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড ৬-৪ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্সকে। ১০ গোলের এই ম্যাচ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলসংখ্যার নতুন রেকর্ড গড়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন এই ম্যাচেই এত বেশি গোল দেখা যায়?

চাপ কম, বাড়ে আক্রমণের ঝোঁক

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ মানসিকতা। সেমিফাইনালে হারের পর শিরোপা জয়ের সুযোগ শেষ হয়ে যায়। ফলে ফাইনালের মতো বাড়তি চাপ আর থাকে না। দুই দলই শেষ ম্যাচটি জয় দিয়ে শেষ করতে চায়। সেই মানসিক অবস্থার প্রভাব পড়ে খেলার ধরনেও।

রক্ষণ সামলে ঝুঁকি না নেওয়ার প্রবণতার বদলে দলগুলো আক্রমণে বেশি মনোযোগ দেয়। ম্যাচও হয়ে ওঠে অনেক বেশি উন্মুক্ত।

আরও পড়ুন: গোল্ডেন বুট জিততে মেসির সামনে যে সমীকরণ

২০২৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলও একই বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো খেলোয়াড়ই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে চায় না, সবাই চায় ফাইনালে খেলতে। সেই হতাশার পর খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থাও স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন হয়ে যায়।

IMG_1795

বদলে যায় কৌশল

এই ম্যাচে কোচরা প্রায়ই কৌশলে পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে যারা কম সময় খেলেছেন, তাদের অনেককে সুযোগ দেওয়া হয়। তরুণ ফুটবলারদের নিজেদের প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়। আক্রমণভাগে স্বাধীনতা বাড়ে। রক্ষণেও দেখা যায় তুলনামূলক কম সতর্কতা। সব মিলিয়ে ম্যাচের গতি বেড়ে যায়, বাড়ে গোলের সম্ভাবনাও।

ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালির সালভাতোরে স্কিলাচ্চি এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার দাভর শুকের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল করেই নিশ্চিত করেছিলেন গোল্ডেন বুট। তাই অনেক ফরোয়ার্ডের কাছে এই ম্যাচ ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনেরও বড় সুযোগ।

ইতিহাসও একই কথা বলছে

বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোলের আধিক্য নতুন নয়। ১৯৭৮ সালের পর থেকে কোনো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়নি।

আরও পড়ুন: ইতিহাস বলছে ফাইনালে হারবে আর্জেন্টিনা, কারণ জেনে নিন

১৯৫৮ সালে ফ্রান্স ৬-৩ গোলে হারিয়েছিল পশ্চিম জার্মানিকে। ১৯৯৪ সালে সুইডেন ৪-০ গোলে জিতেছিল বুলগেরিয়ার বিপক্ষে। ২০০২ সালে তুরস্ক ৩-২ গোলে হারায় দক্ষিণ কোরিয়াকে। ২০১০ সালে জার্মানি একই ব্যবধানে জয় পায় উরুগুয়ের বিপক্ষে। এসব ফলাফল দেখায়, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল নিয়মিতই দেখা যায়।

ব্রোঞ্জ পদকের পাশাপাশি থাকে অর্থের লড়াইও

এই ম্যাচে শুধু সম্মানের প্রশ্নই থাকে না। ব্রোঞ্জ পদকের পাশাপাশি থাকে অর্থ পুরস্কারের বিষয়ও। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানের জন্য ফিফা আলাদা প্রাইজমানি দিয়ে থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল পাবে ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চতুর্থ স্থান পাওয়া দল পাবে ২৭ মিলিয়ন ডলার।

দুই মিলিয়ন ডলারের এই ব্যবধানও ম্যাচটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। অনেক জাতীয় দলের জন্য বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়াও বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

সবাই অবশ্য একমত নন

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ নিয়ে সমালোচনাও আছে। নেদারল্যান্ডসের সাবেক কোচ লুই ফন গাল একে ‘অপ্রয়োজনীয় ম্যাচ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি দল টুর্নামেন্ট শেষ করতে পারে টানা দুই পরাজয় দিয়ে। খেলোয়াড়দের জন্য সেটি মানসিকভাবে কঠিন।

আবার অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের মত ভিন্ন। তাঁদের মতে, ব্রোঞ্জ পদক জয়ের সুযোগ ম্যাচটিকে প্রতিযোগিতামূলক গুরুত্ব দেয়। সম্প্রচার স্বত্ব, দর্শক আগ্রহ এবং টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক মূল্য বিবেচনায়ও এই ম্যাচের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

মোটকথা, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল বেশি হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। সেমিফাইনালের পর মানসিক চাপ কমে যাওয়া, আক্রমণভিত্তিক কৌশল, একাদশে পরিবর্তন, ব্যক্তিগত অর্জনের সুযোগ এবং ব্রোঞ্জ পদক ও প্রাইজমানির প্রেরণা- সব মিলিয়েই ম্যাচের চরিত্র বদলে যায়।

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসও সেই বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়। তাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে কেবল সান্ত্বনার লড়াই বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেক সময় এই ম্যাচেই দর্শকরা উপভোগ করেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে খোলামেলা ও আক্রমণাত্মক ফুটবল।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর