বাংলাদেশে সম্প্রতি লোডশেডিং বেড়েছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তীব্র গরম ও দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ করে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, লোডশেডিং কী? এবং লোডশেডিং কেন হয়? আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ অপরিহার্য হলেও উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে এই সংকট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।
লোডশেডিং আসলে কী?
সহজ ভাষায়, লোডশেডিং হলো বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা দূর করার একটি কৌশল। দেশের নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত বা সরবরাহযোগ্য বিদ্যুতের তুলনায় যখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা বা লোড বেশি হয়ে যায়, তখন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট কিছু এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার এই প্রক্রিয়াকেই লোডশেডিং বলা হয়।

লোডশেডিং কেন হয়?
লোডশেডিংয়ের পেছনে মূলত কয়েকটি প্রধান কারিগরি, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটজনিত কারণ জড়িত রয়েছে-
উৎপাদন ও চাহিদার ঘাটতি: বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় যদি উৎপাদন কম হয়, তবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে এই অতিরিক্ত চাহিদাকে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। পর্যাপ্ত জ্বালানি সংকট বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপকরণের অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।
গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি রক্ষা ও বড় বিপর্যয় এড়ানো: বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ফ্রিকোয়েন্সি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চাহিদার তুলনায় হঠাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে গেলে বা কমে গেলে ফ্রিকোয়েন্সিতে তারতম্য ঘটে। ফ্রিকোয়েন্সি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে সমগ্র দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একযোগে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা বড় ধরনের ব্ল্যাকআউট তথা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে পুরো পাওয়ার গ্রিডকে রক্ষা করার জন্য বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়।

জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা: গ্যাস, এলএনজি বা কয়লার সরবরাহ কমে গেলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধের জটিলতা ও আর্থিক সংকটের কারণেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাধাগ্রস্ত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
আরও পড়ুন: নেট মিটারিং কী? কীভাবে সোলার প্যানেল থেকে আয় করবেন
বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি ও সিস্টেম লস: অনেক সময় উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলেও দুর্বল বিতরণ ব্যবস্থা, সাবস্টেশনগুলোর মধ্যে সঠিক সিনক্রোনাইজিং বা সামঞ্জস্যের অভাব এবং সিস্টেম লসের কারণে গ্রাহক পর্যন্ত ঠিকমতো বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে বিতরণ লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অনেক এলাকায় অনিচ্ছাকৃত লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।

লোডশেডিং সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে আনলেও, পুরো জাতীয় বিদ্যুৎকে বড় ধরনের ধস বা ব্ল্যাকআউট থেকে রক্ষা করতে এটি একটি বাধ্যতামূলক প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ। এই দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে হলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সুব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সোলার, বায়ুকলের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কমানো সম্ভব।
এজেড




