রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

সমুদ্রের গভীরে ‘অদৃশ্য বাদুড়’: ডুবোজাহাজের রণকৌশলের নেপথ্য বিজ্ঞান

বিজ্ঞান ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩০ এএম

শেয়ার করুন:

সমুদ্রের গভীরে ‘অদৃশ্য বাদুড়’: ডুবোজাহাজের রণকৌশলের নেপথ্য বিজ্ঞান
সমুদ্রের ‘অদৃশ্য বাদুড়’: যেভাবে বাবল জেট ইফেক্টে রণতরি ধ্বংস করে সাবমেরিন

সমুদ্রের অতল গহীনে নিঃশব্দে বিচরণ করা সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজকে আধুনিক নৌযুদ্ধের সবচেয়ে রহস্যময় অস্ত্র বলা হয়। রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে পানির নিচে লুকিয়ে থাকার অদম্য ক্ষমতার কারণে একে ডাকা হয় ‘সমুদ্রের অদৃশ্য বাদুড়’। সম্প্রতি ভারত মহাসাগরে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ ধ্বংসের নেপথ্যে মার্কিন সাবমেরিনের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে সাবমেরিন যুদ্ধের বিজ্ঞানকে। কীভাবে একটি অদৃশ্য যান বিশালাকার সব রণতরি নিমেষেই ডুবিয়ে দেয়, তার নেপথ্যে রয়েছে শব্দের খেলা আর পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ।

সাবমেরিন কেন ‘সমুদ্রের বাদুড়’?


বিজ্ঞাপন


আকাশে বাদুড় যেভাবে পথ চলে, সাবমেরিনও পানির নিচে ঠিক একই নীতি অনুসরণ করে। বাদুড় অন্ধকারের মধ্যে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ (Ultrasound) নির্গত করে এবং সেই শব্দ কোনো বস্তুতে বাধা পেয়ে ফিরে এলে তার দূরত্ব ও অবস্থান বুঝতে পারে। একে বলা হয় ‘ইকোলোকেশন’।

সাবমেরিন এই একই প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় সোনার (SONAR - Sound Navigation and Ranging) প্রযুক্তি। পানির নিচে আলো খুব বেশি দূর যেতে পারে না, কিন্তু শব্দ তরঙ্গ হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করতে পারে। সাবমেরিন থেকে পাঠানো শব্দ তরঙ্গ যখন শত্রু জাহাজের গায়ে লেগে ফিরে আসে, তখন সাবমেরিনের ভেতরে থাকা কম্পিউটার নিখুঁতভাবে বলে দেয় জাহাজটি কত দূরে, কোন দিকে এবং কত গতিতে চলছে।

নিস্তব্ধতাই যখন মারণাস্ত্র

মার্কিন ভার্জিনিয়া-শ্রেণীর মতো আধুনিক সাবমেরিনগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের ১০০ থেকে ৩০০ মিটার গভীরে অবস্থান করে। এদের ইঞ্জিন ও প্রপালশন সিস্টেম এতটাই নিঃশব্দ যে, পানির নিচে সাঁতার কাটা কোনো মানুষের শব্দের চেয়েও এদের শব্দ কম হয়। ফলে উপরে থাকা যুদ্ধজাহাজ বুঝতেই পারে না যে তাদের ঠিক নিচেই একটি ‘শিকারি’ ওত পেতে আছে।


বিজ্ঞাপন


টর্পেডোর আঘাত ও ‘বাবল জেট ইফেক্ট’

সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডো কেবল একটি পানির নিচের মিসাইল নয়, এটি একটি বুদ্ধিমান মারণাস্ত্র। ৬-৭ মিটার লম্বা এই টর্পেডোগুলো ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ নীতিতে চলে। অর্থাৎ একবার ছুড়ে দিলে এটি নিজেই জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়।

war

তবে আধুনিক টর্পেডো সরাসরি জাহাজের গায়ে আঘাত না করে জাহাজের ঠিক নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরিত হয়। এর পেছনে রয়েছে ‘বাবল জেট ইফেক্ট’ (Bubble Jet Effect) নামক এক বিধ্বংসী বিজ্ঞান-

১. গ্যাসীয় বুদবুদ: টর্পেডো যখন জাহাজের নিচে বিস্ফোরিত হয়, তখন সেখানে প্রচণ্ড চাপে একটি বিশাল গ্যাসীয় বুদবুদ তৈরি হয়।

২. জাহাজ উত্তোলন: এই বুদবুদের চাপে আস্ত যুদ্ধজাহাজটি মাঝখান থেকে ধনুকের মতো বেঁকে উপরে উঠে যায়।

৩. কাঠামোগত ভাঙন: কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুদবুদটি যখন ফেটে যায়, তখন সেখানে একটি শূন্যস্থান (Vacuum) তৈরি হয়। ফলে মহাকর্ষ বলের টানে বিশালাকার জাহাজটি আবার সজোরে নিচে পড়ে যায়।

এই হঠাৎ উঁচুতে ওঠা এবং আবার আছড়ে পড়ার ফলে জাহাজের মূল কাঠামো বা ‘কিল’ (Keel) ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় বিশাল কোনো ছিদ্র ছাড়াই আস্ত একটি রণতরি কয়েক মিনিটের মধ্যে সলিল সমাধি লাভ করে।

আরও পড়ুন: টর্পেডো কী, এটি কী কাজে লাগে?

প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতা যেমন সাবমেরিনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, তেমনি সমুদ্রের গভীরে যুদ্ধকে করে তুলেছে আরও বেশি নিঃশব্দ ও ভয়ংকর।

এজেড

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর