সম্প্রতি ভারত মহাসাগরে মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে শত্রু জাহাজ ডোবানোর ঘটনা ঘটল। এই ঘটনার পর সামরিক বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে টর্পেডোর কার্যক্ষমতা ও এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
টর্পেডো আসলে কী?
বিজ্ঞাপন
সহজ কথায় বলতে গেলে, টর্পেডো হলো পানির তলদেশে চলতে সক্ষম এক ধরনের শক্তিশালী স্ব-চালিত মিসাইল বা বিস্ফোরক। এটি এমন এক সমরাস্ত্র যা পানির নিচ দিয়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হয় এবং সরাসরি আঘাত হেনে বা কাছাকাছি গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এর ভেতরে সমুদ্রযান বা সাবমেরিন ধ্বংস করার জন্য বিপুল পরিমাণ ‘ওয়ারহেড’ বা বিস্ফোরক মজুত থাকে। সামরিক পরিভাষায় একে ‘সেলফ-প্রোপেলড গাইডেড উইপন’ বলা হয়।

টর্পেডো কী কাজে লাগে এবং কীভাবে কাজ করে?
টর্পেডোর মূল কাজ হলো শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন ধ্বংস করা। এটি সাধারণত নৌবাহিনী ব্যবহার করে থাকে। এর কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত জটিল ও নিখুঁত-
বিজ্ঞাপন
লঞ্চিং প্ল্যাটফর্ম: টর্পেডো কেবল সাবমেরিন নয়, বরং যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার বা বিমান থেকেও নিক্ষেপ করা যায়।
লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ: আধুনিক টর্পেডোগুলো ‘সোনার’ (SONAR) প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে। কিছু টর্পেডো তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, আবার কিছু থাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়।

ধ্বংস করার কৌশল: হেভিওয়েট টর্পেডোগুলো (যেমন: মার্কিন মার্ক-৪৮) সাধারণত জাহাজের গায়ে সরাসরি আঘাত না করে জাহাজের ঠিক নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে পানির নিচে বিশাল চাপের সৃষ্টি হয় যা জাহাজের মূল কাঠামো বা ‘মেরুদণ্ড’ মুহূর্তেই ভেঙে দেয়। ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই টুকরো হয়ে সাগরে তলিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় ডুবল ইরানি যুদ্ধজাহাজ, নিহত ৮৭
বিশ্বের ৫টি আধুনিক ও শক্তিশালী টর্পেডো
প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বর্তমান বিশ্বের টর্পেডোগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দূরপাল্লার ও নিখুঁত হয়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য পাঁচটি টর্পেডো হলো:
১. মার্ক-৪৮ (MK-48): যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই হেভিওয়েট টর্পেডোটি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে। এটি সোনার ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং যেকোনো বড় জাহাজকে দ্বিখণ্ডিত করতে সক্ষম।
২. এফ-২১ (F21): ফ্রান্সের তৈরি নতুন প্রজন্মের এই টর্পেডোটি গভীর ও অগভীর উভয় পানিতে অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি প্রায় ৫০ কিমি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
৩. স্পেয়ারফিশ (Spearfish): যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির এই টর্পেডোটি প্রায় ৩০০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন।
৪. ব্ল্যাক শার্ক (Black Shark): ইতালির তৈরি এই টর্পেডোটি বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা যায় এবং এটি দীর্ঘ সময় পানির নিচে লক্ষ্যবস্তুর জন্য ওত পেতে থাকতে পারে।
৫. পোসেইডন (Poseidon): রাশিয়ার তৈরি এটি বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও শক্তিশালী টর্পেডো। এটি মূলত পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি আন্ডারওয়াটার ড্রোন, যা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।

কেন এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিসাইলের চেয়েও টর্পেডো অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ মিসাইল আকাশ দিয়ে আসার সময় রাডারে ধরা পড়ে এবং তা ধ্বংস করার সুযোগ থাকে। কিন্তু টর্পেডো পানির গভীর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে, যা আগে থেকে শনাক্ত করা কঠিন। পেন্টাগন তাই একে ‘নীরব মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এজেড

