প্রিয়জনকে হারানোর শূন্যতা সহজে পূরণ হয় না। তাই অনেকে মনে মনে চান, একবার স্বপ্নে যদি তাকে দেখা যেত! কেউ স্বপ্নে দেখে প্রশান্তি পান, আবার কেউ বছরের পর বছর না দেখে ভাবেন, তিনি কি অভিমান করেছেন, নাকি কষ্টে আছেন? ইসলামের দৃষ্টিতে এর উত্তর কী? মৃত আপনজন কি নিজ থেকে স্বপ্নে দেখা দিতে পারেন? আর স্বপ্নে আসা বা না আসার সঙ্গে কি তার পরকালীন অবস্থার কোনো সম্পর্ক আছে?
স্বপ্নে না দেখা মানে কি তিনি কষ্টে আছেন?
মৃত ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় স্বপ্নে আসতে পারেন কি না, কোরআন-সুন্নাহতে এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আল্লাহ চাইলে কেউ স্বপ্নে প্রিয়জনকে দেখেন, আবার কেউ বছরের পর বছর দেখেন না।
তাই স্বপ্নে না দেখার অর্থ এই নয় যে তিনি কষ্টে আছেন, রাগ করেছেন বা আপনার দোয়া কবুল হচ্ছে না। এসব ধারণার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আবার স্বপ্নে দেখলেই ধরে নেওয়া যায় না যে তিনি কোনো বার্তা দিতে এসেছেন কিংবা তার পরকালীন অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানা গেছে।
স্বপ্নে দেখা কি তা কোনো বার্তা?
হাদিসে এসেছে, স্বপ্ন তিন রকম। কিছু স্বপ্ন পছন্দনীয়; তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিছু শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর কিছু মানুষের নিজের ভাবনার প্রতিফলন। (সহিহ মুসলিম: ৫৭৯৮)
আরও পড়ুন: স্বপ্নের ওপর ধর্মীয় বিধান নির্ভর করা যাবে না: কাবার ইমাম
প্রিয়জন হারানোর পর তার স্মৃতি, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের কষ্ট মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেই ভাবনাই অনেক সময় স্বপ্নে ফিরে আসে। আবার কোনো ভালো স্বপ্ন মনে প্রশান্তিও এনে দিতে পারে।
স্বপ্নে পরকালের অবস্থা বোঝা যায় না
মৃত ব্যক্তিকে হাসিমুখে দেখলেই তার জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায় না। আবার অসুস্থ বা কষ্টে দেখলেও তার পরকালীন অবস্থা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। স্বপ্নের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কিংবা নতুন কোনো ধর্মীয় বিধান চালু করাও ঠিক নয়।
মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলে কী করবেন?
পছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে: আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করুন। রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, যখন কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা সে পছন্দ করে, তাহলে মনে করবে যে তা আল্লাহর তরফ থেকে হয়েছে। তখন সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। (সহিহ বুখারি: ৭০৪৫)
আরও পড়ুন: ভয়ের স্বপ্ন বন্ধ হবে যে আমলে
অস্বস্তিকর স্বপ্ন দেখলে: রাসুলুল্লাহ (স.) অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে তিনবার হালকা থুতু ফেলার মতো করতে, শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমন স্বপ্ন কাউকে না জানাতেও বলেছেন। অন্য বর্ণনায় পাশ পরিবর্তনের কথাও এসেছে। (সহিহ মুসলিম: ২২৬১; সহিহ বুখারি: ৭০৪৪)
মৃত ব্যক্তিকে কষ্টে দেখলে: স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে কষ্টকর অবস্থায় দেখলেই তিনি পরকালে কষ্টে আছেন, এমন ধারণা করা ঠিক নয়। তার জন্য দোয়া করুন। সামর্থ্য থাকলে সদকাও করতে পারেন। তবে এমন স্বপ্ন দেখার কারণে সদকা করা বাধ্যতামূলক নয়।
মৃত ব্যক্তির জন্য কী আমল করবেন?
মৃত বাবা-মা ও আপনজনের জন্য দোয়া করা এবং তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা শরিয়তসম্মত আমল। এসব করার জন্য মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা জরুরি নয়।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের একটি দোয়া শিখিয়েছেন- رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ উচ্চারণ: রব্বানাগফির লানা ওয়া লিইখওয়ানিনাল্লাযিনা সাবাকুনা বিল ঈমান। অর্থ: ‘হে আমাদের রব, আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও, যারা ঈমানের সঙ্গে আমাদের আগে চলে গেছে।’ (সুরা হাশর: ১০)
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার মৃত মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি সওয়াব পাবেন কি না। নবীজি (স.) উত্তরে সম্মতি দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি: ১৩৮৮)
মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ বা মানুষের হক বাকি থাকার তথ্য থাকলে তা যাচাই করে আদায়ের ব্যবস্থা করুন। আর তার জন্য নিয়মিত দোয়া করুন, সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন। এসব কল্যাণকর কাজের জন্য স্বপ্নে তার উপস্থিতির অপেক্ষা করতে হয় না।
তথ্যসূত্র: সুরা হাশর: ১০; সহিহ বুখারি: ১৩৮৮, ৭০৪৪-৭০৪৫; সহিহ মুসলিম: ৫৭৯৮, ২২৬১




