ঈমান, সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা ও হালাল রিজিক আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। এসবের মূল্য আমরা অনেক সময় হারানোর আগে বুঝতে পারি না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।’ (সুরা নাহল: ১৮)
তাই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এবং সেগুলোর কল্যাণ অব্যাহত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন একটি দোয়া করতেন, যেখানে নেয়ামত হারানো, সুস্থতা ও নিরাপত্তার পরিবর্তন, আকস্মিক শাস্তি এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
নেয়ামত হারানো থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এই দোয়া করতেন- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ، وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ، وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ، وَجَمِيعِ سَخَطِكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন যাওয়ালি নি‘মাতিকা, ওয়া তাহাওউলি আফিয়াতিকা, ওয়া ফুজাআতি নিকমাতিকা, ওয়া জামি‘ই সাখাতিকা।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নেয়ামত হারিয়ে যাওয়া থেকে, আপনার দেওয়া সুস্থতা ও নিরাপত্তার পরিবর্তন থেকে, আপনার আকস্মিক শাস্তি থেকে এবং আপনার সব ধরনের অসন্তুষ্টি থেকে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৯)
ছোট এই দোয়ায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: সকালে ও সন্ধ্যায় যে দোয়া পড়তে বলেছেন নবীজি
১. নেয়ামত হারানো থেকে আশ্রয়
ঈমান, সুস্থতা, পরিবার, জীবিকা ও নিরাপত্তা - সবই আল্লাহর দান। এসব নেয়ামতের যথাযথ কদর করা এবং সেগুলোর জন্য শুকরিয়া আদায় করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। তবে কোনো নেয়ামত হারিয়ে যাওয়াই যে অকৃতজ্ঞতার ফল, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
তাই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি সেগুলোর কল্যাণ অব্যাহত থাকা এবং হারিয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষার জন্যও আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
২. সুস্থতা ও নিরাপত্তার পরিবর্তন থেকে আশ্রয়
দোয়ার দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ‘আফিয়াত’ হারিয়ে যাওয়া বা পরিবর্তিত হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা। আফিয়াত বলতে সুস্থতা, নিরাপত্তা ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার মতো কল্যাণ বোঝানো হয়।
মানুষ সুস্থ থাকলে ইবাদত করতে পারে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারে। নিরাপদ থাকলে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু অসুস্থতা কিংবা নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে স্বাভাবিক কাজগুলোও কঠিন হয়ে ওঠে।
দোয়ার এই অংশে আল্লাহর দেওয়া আফিয়াতের অবস্থা বদলে যাওয়া বা তা হারিয়ে ফেলা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: সবসময় সুস্থ থাকতে যে দোয়া ৩ বার পড়বেন
৩. আকস্মিক শাস্তি থেকে আশ্রয়
দোয়ার তৃতীয় অংশে আল্লাহর আকস্মিক শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবকিছু জানে না। কখন কোন বিপদ আসবে কিংবা কোনো কাজের পরিণতি কী হবে, তা সবসময় বুঝতে পারে না।
এই প্রার্থনা মানুষকে আত্মসচেতন হতে, আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বাঁচতে এবং নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে উদ্বুদ্ধ করে। একই সঙ্গে এটি আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা চাওয়ার শিক্ষা দেয়।
৪. আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয়
দোয়ার শেষ অংশে আল্লাহর সব ধরনের অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। একজন মুমিনের কাছে দুনিয়ার নেয়ামত গুরুত্বপূর্ণ, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পদ, সুস্থতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি আল্লাহর অবাধ্যতায় জীবন কাটায়, তাহলে বাহ্যিক প্রাচুর্য তার সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই একজন মুমিন দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টিও কামনা করেন।
নেয়ামত টিকিয়ে রাখার উপায়
দোয়ার পাশাপাশি নেয়ামতের কদর করা এবং সেগুলোর সঠিক ব্যবহার করাও জরুরি। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-
কৃতজ্ঞতা: আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা।
সঠিক ব্যবহার: সুস্থতা, সময় ও সম্পদ ভালো কাজে ব্যয় করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
অন্যের হক আদায়: নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা।
একটি ভুল বোঝাবুঝি
জীবনে কোনো নেয়ামত কমে যাওয়া বা বিপদ আসা মানেই আল্লাহ অসন্তুষ্ট-এমন মনে করা ঠিক নয়। বিপদ কখনো পরীক্ষা হতে পারে, কখনো গুনাহ মোচনের মাধ্যম হতে পারে। তাই বিপদে ধৈর্য ধরতে হবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
এই দোয়া নিজের জন্য সতর্কতা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা। অন্য কাউকে দোষারোপ করার হাতিয়ার নয়।
দোয়াটি মুখস্থ করে অর্থ বুঝে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। আল্লাহ আমাদের নেয়ামতের কদর করার, তাঁর শুকরিয়া আদায় করার এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সুরা নাহল: ১৮; সুরা ইবরাহিম: ৭; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৯




