বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

রাগের মাথায় বদদোয়া নয়, যে দোয়া করতে বলেছে ইসলাম

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

রাগের মাথায় বদদোয়া নয়, যে দোয়া করতে বলেছে ইসলাম

কেউ কষ্ট দিলে, অপমান করলে কিংবা অন্যায়ভাবে আঘাত করলে মনে প্রচণ্ড রাগ জমে। কখনো সেই রাগ থেকে মুখে চলে আসে বদদোয়া- ‘তুমিও একদিন এমন কষ্ট পাও’, ‘তোমার জীবনও অশান্তিতে ভরে উঠুক।’ আবার অনেক মা-বাবা রাগের মাথায় সন্তানকেই বলে ফেলেন, ‘ধ্বংস হও’ কিংবা ‘তোমার মরণ হোক’, অথচ মনের গভীরে তাঁরা সন্তানের কল্যাণই চান।

কষ্টের মুহূর্তে এমন কথা বেরিয়ে এলে পরে অনুশোচনা হয়। তাই রাগের সময় মুখের কথার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। ইসলাম মানুষের কষ্টকে অস্বীকার করে না। অন্যায়ের শিকার হলে নিজের অধিকার চাওয়া কিংবা আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ নয়। তবে রাগের বশে সীমা ছাড়ানো, অন্যের অকল্যাণ কামনা করা এবং প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা থেকে ইসলাম সতর্ক করে।

রাগের সময় নিজেকে সংযত করাই মুমিনের গুণ

আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)

এখানে রাগ হওয়াকে অস্বাভাবিক বলা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাগের কারণে মানুষ কী করছে। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বললেন, ‘রাগ করো না।’ লোকটি বারবার উপদেশ চাইলেও তিনি একই কথা বললেন। (সহিহ বুখারি: ৬১১৬)

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়। প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহিহ বুখারি: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৯)

অর্থাৎ রাগের মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে পারাও শক্তির পরিচয়। কাউকে কষ্ট দিয়ে নিজের রাগ প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু কষ্ট পেয়েও অন্যায় কথা বলা থেকে বিরত থাকা আত্মসংযমের পরিচয়।

আরও পড়ুন: রাগ নিয়ন্ত্রণ করলে আল্লাহ যে পুরস্কার দেবেন

নিজের সন্তান ও সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া নয়

সন্তান ভুল করলে কিংবা অবাধ্য আচরণ করলে মা-বাবার রাগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই রাগের মুহূর্তে সন্তানের অমঙ্গল কামনা করা উচিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এমন কোনো সময়ের সঙ্গে তা মিলে যেতে পারে, যখন দোয়া কবুল হয়। (সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ)

তাই সন্তানকে ‘ধ্বংস হও’ কিংবা ‘তোমার মরণ হোক’ বলার পরিবর্তে তার সংশোধনের জন্য দোয়া করুন। রাগের মাথায় বলা কথা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না সব সময়, কিন্তু কথা বলার আগে নিজেকে থামানো যায়।

সন্তানকে শাসন করতে হলে ভুলটি বুঝিয়ে বলুন, প্রয়োজন হলে উপযুক্ত শাস্তি বা শৃঙ্খলার ব্যবস্থা নিন। তার অকল্যাণ কামনা না করে সংশোধন ও কল্যাণ কামনা করুন।

রাগ এলে যা করতে পারেন

১. আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চান

দুই ব্যক্তি পরস্পরকে গালমন্দ করছিলেন। তাদের একজনের চেহারা রাগে লাল হয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, তিনি এমন একটি বাক্য জানেন, যা ওই ব্যক্তি বললে তার রাগ দূর হতে পারে। বাক্যটি হলো-

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ উচ্চারণ: আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম। অর্থ: বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। (সহিহ বুখারি: ৩২৮২)

রাগের সময় এই বাক্যটি বলুন এবং নিজেকে অন্যায় কথা বলা থেকে বিরত রাখুন।

আরও পড়ুন: আল্লাহর রাগ কমাতে চান? এই আমলগুলো করুন

২. অবস্থান পরিবর্তন করুন

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কারও রাগ হলে সে যেন বসে পড়ে। তাতেও রাগ না কমলে শুয়ে পড়ে। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮২)

এর পাশাপাশি কিছুক্ষণ নীরব থাকুন, প্রয়োজনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ থেকে সরে যান। মন শান্ত হওয়ার আগে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো।

বদদোয়ার বদলে যে দোয়াগুলো করতে পারেন

রাগ, কষ্ট কিংবা অপমানের মুহূর্তে কারও অকল্যাণ কামনা না করে তার সংশোধন, নিজের সংযম এবং ন্যায়বিচারের জন্য দোয়া করা যায়। এ ক্ষেত্রে দুটি মাসনুন দোয়া ও আরও দুটি ব্যক্তিগত দোয়া পড়তে পারেন।

১. হেদায়াতের জন্য দোয়া

আরবি: اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا وَأْتِ بِهِمْ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদি দাওসান, ওয়া’তি বিহিম। অর্থ: ‘হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হেদায়াত দিন এবং তাদের নিয়ে আসুন।’

একবার এক সাহাবি দাওস গোত্রের অবাধ্যতার কথা জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে বলেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের জন্য বদদোয়া না করে হেদায়াতের দোয়া করেন। (সহিহ বুখারি: ২৯৩৭)

নোট: এটি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দাওস গোত্রের জন্য করা দোয়া। অন্য কারও হেদায়াতের জন্য চাইলে বাংলায় এভাবে দোয়া করতে পারেন- ‘হে আল্লাহ, তাকে হেদায়াত দিন এবং সঠিক পথে ফিরিয়ে আনুন।’

২. ক্ষমার জন্য দোয়া

আরবি: رَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ উচ্চারণ: রাব্বিগফির লি-কাওমি, ফা-ইন্নাহুম লা ইয়া‘লামুন। অর্থ: ‘হে আমার রব, আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই তারা জানে না।’

রাসুলুল্লাহ (স.) এক পূর্ববর্তী নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এই দোয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে আঘাত করেছিল, তবু তিনি তাদের ক্ষমার জন্য দোয়া করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৩৪৭৭)

৩. রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখার জন্য দোয়া

নিজের ভাষায় এভাবে দোয়া করতে পারেন- ‘হে আল্লাহ, রাগের মুহূর্তে আমাকে ধৈর্য ধরার তাওফিক দিন। আমার মুখ ও আচরণকে এমন কথা ও কাজ থেকে রক্ষা করুন, যা পরে আমার অনুশোচনার কারণ হবে।’

৪. কষ্টের মুহূর্তে ন্যায়বিচার ও মানসিক প্রশান্তির জন্য দোয়া

নিজের ভাষায় এভাবেও দোয়া করতে পারেন- ‘হে আল্লাহ, আমার প্রতি কেউ অন্যায় করে থাকলে আপনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। আমার অন্তরকে প্রশান্ত করুন, আমাকে ক্ষমাশীল হওয়ার শক্তি দিন এবং অন্যায়ের জবাবে অন্যায় করা থেকে রক্ষা করুন।’

বদদোয়া করার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন

আমি কি সত্যিই ন্যায়বিচার চাইছি, নাকি অন্য কেউও আমার মতো কষ্ট পাক, সেটাই চাইছি? দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। ন্যায়বিচার চাওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু প্রতিশোধের নেশায় নিজের সীমা ভুলে যাওয়া বিপজ্জনক।

জীবনে এমন মানুষ আসতে পারে, যারা বিশ্বাস ভাঙবে, অপমান করবে কিংবা অন্যায় আচরণ করবে। তাদের আচরণে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। সেই কষ্ট আল্লাহর কাছে প্রকাশ করুন। প্রয়োজন হলে নিজের অধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ নিন। তবে অন্যের অন্যায়ের কারণে নিজেকেও অন্যায়ের পথে ঠেলে দেবেন না।

সব কষ্টের জবাব বদদোয়া হতে হবে না। কখনো অন্যের সংশোধন কামনা করুন, কখনো নিজের প্রশান্তির জন্য দোয়া করুন, কখনো ন্যায়বিচার চান। আর কখনো কষ্টের ভার আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে সামনে এগিয়ে যান। 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর