মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অশালীন আচরণ ও অপরাধের বিস্তার

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

অশালীন আচরণ ও অপরাধের বিস্তার

সমাজে অপরাধ হঠাৎ তৈরি হয় না। মানুষের আচরণ ও মূল্যবোধে পরিবর্তনের সঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে অশালীন কথা, কুরুচিপূর্ণ রসিকতা, অন্যের সম্মানহানি কিংবা প্রকাশ্যে অশ্লীলতার চর্চা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মনে হতে থাকে। ইসলাম তাই শুধু অপরাধ নিষিদ্ধ করেনি, অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন কাজ থেকেও দূরে থাকতে বলেছে।

লজ্জা ঈমানের অংশ

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি: ৯)

লজ্জা শুধু পোশাকের বিষয় নয়। কথা, দৃষ্টি, আচরণ ও অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর ক্ষেত্রেও সংযম থাকা জরুরি। মানুষের ভেতরের এই সংযম দুর্বল হলে অশালীন আচরণ সহজেই জায়গা করে নিতে পারে।

অশ্লীলতার কাছেও যেতে নিষেধ

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে, অশ্লীল কাজের কাছেও যাবে না’ (সুরা আনআম: ১৫১)

ব্যভিচার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা ইসরা: ৩২)

এখানে শুধু অপরাধের কথাই বলা হয়নি, তার দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথ থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে। এ কারণেই দৃষ্টি সংযত রাখা এবং নারী-পুরুষ উভয়ের শালীনতা রক্ষার নির্দেশ এসেছে। (সুরা নূর: ৩০-৩১)

আরও পড়ুন: নারীর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে অপমান: ইসলাম কী বলে

ব্যক্তিস্বাধীনতা মানেই সামাজিক দায়হীনতা নয়

পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকতে পারে। তবে জনসমক্ষে নিজের আচরণ কেমন হবে, তা বিবেচনার সময় সামাজিক পরিবেশ ও অন্যের অধিকারের বিষয়টিও সামনে রাখা দরকার।

কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা আচরণকে সরাসরি অপরাধের কারণ বলা ঠিক নয়। কেউ অপরাধ করলে তার দায় অপরাধীরই। একই সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ যখন বারবার প্রকাশ্যে দেখা যায়, তখন মানুষের কাছে সেটি ধীরে ধীরে পরিচিত ও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। এতে অশালীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক আপত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই নিজের পছন্দের পাশাপাশি কোথায়, কীভাবে এবং কার সামনে কোনো আচরণ করা হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করা সামাজিক দায়িত্বের অংশ। ইসলামের শালীনতার শিক্ষা এই ভারসাম্যই তৈরি করতে চায়।

অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ

আল্লাহ বলেন, ‘যারা চায় মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।’ (সুরা নূর: ১৯)

তাই অশালীন ছবি বা ভিডিও ছড়ানো, বিনোদনের নামে অশ্লীলতা প্রচার করা কিংবা কারও সম্মানহানি হয় এমন বিষয় প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশ বা শেয়ার করার আগে এর প্রভাবও বিবেচনা করা উচিত।

আরও পড়ুন: অশ্লীল কিছু চোখে পড়লে যে দোয়া পড়বেন

কথাবার্তাতেও শালীনতা

অশালীনতা শুধু পোশাক বা দৃষ্টির বিষয় নয়। গালাগাল, কুরুচিপূর্ণ রসিকতা, অশ্লীল কথা এবং অন্যকে অপমান করাও এর মধ্যে পড়ে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুমিন দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল ও কদর্যভাষী নয়।’ (জামে তিরমিজি: ১৯৭৭)

তাই কাউকে অপমান করা, যৌন হয়রানি করা কিংবা অশালীন মন্তব্য করাকে ছোট বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অন্যের সম্মান রক্ষা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এক মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

তাই কারও দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা, সম্মানহানি করা বা হয়রানি করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। কেউ অপরাধের শিকার হলে তাকে দোষারোপ করাও সঠিক নয়। অপরাধের দায় অপরাধীরই।

প্রতিরোধের শুরু পরিবার থেকে

সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই লজ্জা, শালীনতা, অন্যের সম্মান এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তারা কী দেখছে এবং কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সে বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করা। কেউ হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা উচিত।

অপরাধ দমনে আইন ও শাস্তি জরুরি। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে লজ্জাবোধ, তাকওয়া, সংযম এবং অন্যের মর্যাদার প্রতি সম্মানও প্রয়োজন। কারণ সমাজে কোনো আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আগেই তার ভালো-মন্দ নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: সুরা আনআম ১৫১; সুরা ইসরা ৩২; সুরা নূর ১৯, ৩০-৩১; সহিহ বুখারি: ৯; জামে তিরমিজি: ১৯৭৭

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর