একটি রাষ্ট্রের আইন মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবার, অধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার ও সামাজিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার অবস্থান কী- এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে আইন শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের বিষয় নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, আমানত রক্ষা ও জুলুম প্রতিরোধও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ
কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদেরও। অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হও। এটাই উত্তম এবং পরিণামের দিক থেকে সর্বোত্তম।’ (সুরা নিসা: ৫৯)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে তারা আপনাকে বিচারক মানে, এরপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো সংকোচ না রাখে এবং পূর্ণভাবে মেনে নেয়।’ (সুরা নিসা: ৬৫)
এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, একজন মুসলিমের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনা চূড়ান্ত নীতিগত মানদণ্ড।
কোরআন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের নির্দেশনা নয়
কোরআনকে শুধু নামাজ, রোজা বা ব্যক্তিগত ইবাদতের গ্রন্থ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও নৈতিক নির্দেশনার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। কোরআনে বিচার, আমানত, পরিবার, সম্পদ, উত্তরাধিকার, চুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা এসেছে।
আরও পড়ুন: সম্পত্তি বণ্টনে নতুন আইন কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে চ্যালেঞ্জের শামিল
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করতে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)
আরও বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করার জন্য প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা: ৮)
অর্থাৎ ইসলামি দৃষ্টিতে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিধানের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার এবং জুলুম প্রতিরোধের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে
ইসলামি শরিয়তে কিছু বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহয় সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে; যেমন উত্তরাধিকার, বিবাহ-তালাকের নির্দিষ্ট বিধান, সুদ, মদ, ব্যভিচার, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, জুলুম, মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ ও আমানতের খেয়ানত সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে।
এসব বিষয়ে একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো বিধানকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার করো এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।’ (সুরা মায়েদা: ৪৯)
তবে কোনো আয়াত বা হাদিসকে বিচ্ছিন্নভাবে নিয়ে বিধান নির্ধারণ করা ইসলামি পদ্ধতি নয়। সংশ্লিষ্ট সব দলিল, শরিয়তের সামগ্রিক নীতি এবং যোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যা বিবেচনায় নিয়েই এসব বিধান বুঝতে ও প্রয়োগ করতে হয়।
নতুন বিষয়ে ইজতিহাদের সুযোগ
আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসন, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যসহ অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যেগুলোর বিস্তারিত বিধান কোরআন-হাদিসে সরাসরি উল্লেখ নেই। এসব ক্ষেত্রে ইসলামি আইনশাস্ত্রে ইজতিহাদ, কিয়াস, ইজমা, মাসলাহা ও প্রচলিত রীতিনীতির মতো স্বীকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে বিধান নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। শর্ত হলো, তা যেন কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও শরিয়তের মৌলিক নীতির বিরোধী না হয়।
আরও পড়ুন: সুন্নাহ অস্বীকার করা কোরআন না মানার নামান্তর
ইসলামের ইতিহাসে ফকিহ ও আলেমরা নতুন পরিস্থিতিতে গবেষণা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিধান নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন মাজহাব ও ফিকহি ধারায় কিছু বিষয়ে মতপার্থক্যও দেখা গেছে।
অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহকে আইনের মূল নির্দেশনা মানার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক বিধান হুবহু কোনো আয়াত বা হাদিস থেকে উদ্ধৃত করতে হবে। যেখানে স্পষ্ট বিধান আছে, সেখানে তা মান্য করা জরুরি। আর যেখানে নির্দিষ্ট বিধান নেই, সেখানে শরিয়তের স্বীকৃত নীতির আলোকে যোগ্য ব্যক্তিদের গবেষণা ও ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে।
আইনের মূল্যায়নে ন্যায়বিচারও গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও জুলুম প্রতিরোধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা নাহল: ৯০)
তাই কোনো আইন শুধু মুসলিম দেশের আইন- এই পরিচয় বহন করলেই তা ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায় না। আইনটি প্রকৃতপক্ষে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছে কি না, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করছে কি না এবং কোরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীতে যাচ্ছে কি না- এসবও বিবেচনার বিষয়।
একইভাবে শুধু নাম বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো আইনকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। এর প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ এবং এ বিষয়ে যোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নিতে হয়।
কোরআন-সুন্নাহ মানার অর্থ শুধু দণ্ডবিধি নয়
কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণকে শুধু কয়েকটি দণ্ডবিধি প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। একজন শাসক ও আইনপ্রণেতার জন্য সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা এবং জুলুম থেকে বিরত থাকাও ইসলামি দায়িত্বের অংশ।
এমনকি কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিরূপ মনোভাব থাকলেও তাদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ কোরআনে রয়েছে। (সুরা মায়েদা: ৮)
অর্থাৎ ক্ষমতাবান ও দুর্বল, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও ইসলামি আইন ও শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
মুসলিম দেশে আইন প্রণয়নে কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা মানা মুসলিমের দায়িত্ব। নতুন ও পরিবর্তনশীল বিষয়ে শরিয়তের মূলনীতি, জনকল্যাণ ও যোগ্য আলেমদের ইজতিহাদ বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই আইনের ইসলামি মূল্যায়নে নাম বা পরিচয়ের চেয়ে আল্লাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষাই মূল বিবেচ্য।
সূত্র: সুরা নিসা: ৫৮, ৫৯, ৬৫; সুরা মায়েদা: ৮, ৪৯; সুরা নাহল: ৯০




