নিজের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ কিংবা কোনো অর্জন দেখে কখনো মানুষ নিজেই মুগ্ধ হয়। তখন প্রশ্ন জাগতে পারে- অন্যের নজর ছাড়াও কি নিজের কোনো নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হওয়ার কারণে ক্ষতি হতে পারে? ইসলামে বিষয়টি কীভাবে দেখা হয়?
নজর লাগার বিষয়টি ইসলামে স্বীকৃত। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা বদনজরের প্রভাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা নজরের প্রভাব সত্য।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮)
নিজের কোনো নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হলে
নিজের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ কিংবা অন্য কোনো নেয়ামত দেখে মানুষ মুগ্ধ হতে পারে। এমন অবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং সেই নেয়ামতের জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত।
সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর ঘটনা থেকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। আমের ইবনে রবীআ (রা.) সাহল (রা.)-কে গোসল করতে দেখে তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি নবীজি (স.)-এর কাছে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।’ এরপর আমের (রা.)-কে অজু করতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই পানি সাহল (রা.)-এর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়। (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোনো সৌন্দর্য বা ভালো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। তবে এই হাদিসকে ‘মানুষ নিজের চোখের দৃষ্টিতেই নিজের ওপর নজর লাগিয়ে ফেলে’-এমন সরাসরি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। নিজের কোনো নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হলেও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও বরকত কামনা করা উত্তম।
আরও পড়ুন: বদনজর ও রুকইয়া: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ ও প্রতিকার
মুগ্ধ হলে কী করবেন?
কোনো নেয়ামত নিজের বা অন্যের চোখে ভালো লাগলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। যেমন বলা যায়- اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লি ফিহি। অর্থ: হে আল্লাহ, এতে আমার জন্য বরকত দিন।
এই নির্দিষ্ট শব্দগুলোকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো নির্দিষ্ট দোয়া হিসেবে দাবি করার প্রয়োজন নেই। মূল শিক্ষা হলো- ভালো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য বরকত কামনা করা। নিজের ভাষাতেও আল্লাহর কাছে বরকত চাওয়া যায়।
সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর ঘটনাতেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমির ইবনে রাবিয়া (রা.) তাঁর দেহ দেখে মুগ্ধ হওয়ার পর সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি নবীজি (স.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বরকতের দোয়া করার নির্দেশ দেন। (মুসনাদে আহমাদ: ১৫৫৫০; ইবনে মাজাহ: ৩৫০৯)
নজর লাগলে কী করবেন?
নজরের প্রভাব দেখা দিলে শরিয়তসম্মত রুকইয়া করা যায়। জিবরাইল (আ.) নবীজি (স.)-এর জন্য যে রুকইয়ার দোয়া পড়েছিলেন, তাতে হিংসুকের নজরের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা হয়েছে।
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিক, মিন কুল্লি শাইইন ইউ'যিক, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিক।
অর্থ: আল্লাহর নামে তোমার জন্য রুকইয়া করছি - যা কিছু তোমাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণীর অনিষ্ট এবং হিংসুকের নজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দিন। (সহিহ মুসলিম: ২১৮৬)
নজরের প্রভাব থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, দোয়া করা এবং শরিয়তসম্মত রুকইয়া করা উচিত।
আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রীর সংসারে বদনজর, রুকইয়ার পদ্ধতি কী
সব সমস্যাকেই নজর বলা যাবে না
নজর সত্য-এ বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, জীবনের প্রতিটি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, ব্যর্থতা বা বিপদকে নজরের ফল হিসেবে ধরে নিতে হবে। কোনো সমস্যার বাস্তব কারণ থাকলে সেটিও খুঁজে দেখা জরুরি।
নজরের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে কাউকে সন্দেহ করা, অকারণে আতঙ্কিত হওয়া কিংবা কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। তাবিজ-কবজ বা ভিত্তিহীন কোনো পদ্ধতির পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা, দোয়া ও শরিয়তসম্মত রুকইয়ার পথ অনুসরণ করা উচিত।
নেয়ামত দেখে কীভাবে চলবেন?
নিজের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ বা সাফল্য দেখে আনন্দিত হওয়া দোষের নয়। তবে এসব নেয়ামতের মালিক যে আল্লাহ-এই অনুভূতি থাকা জরুরি। নিজের কোনো ভালো বিষয় দেখে মুগ্ধ হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং তার জন্য বরকত চাওয়া উত্তম।
অন্যের নেয়ামত দেখলেও তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। এতে হিংসা ও ক্ষতিকর দৃষ্টির আশঙ্কা থেকে দূরে থাকা যায়।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ২১৮৬, ২১৮৭; ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮, ৩৫০৯; মুসনাদে আহমদ: ১৫৫৫০




