রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলে কী করতে বলে ইসলাম

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলে কী করতে বলে ইসলাম

একটি দুর্ঘটনা মানুষকে মৃত্যুর খুব কাছে নিয়ে যেতে পারে। জ্ঞান ফিরলে দেখা গেল, তিনি বেঁচে আছেন। চারপাশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন মুহূর্ত জীবনের বাস্তবতা নতুন করে ভাবতে শেখায়। মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে- এই সত্য তখন আর শুধু শোনা কথা থাকে না। নিজের জীবন, আমল এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।

ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা বাধ্যতামূলক করেনি। তবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, তাওবা, মানুষের হক পরিশোধ এবং আখেরাতের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।

প্রথমেই আল্লাহর শুকরিয়া

বিপদ কেটে গেলে একজন মুমিনের মনে প্রথম যে অনুভূতিটি জাগতে পারে, তা হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা। জীবন ও সুস্থতা তাঁরই দেওয়া নেয়ামত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমান আন, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কী করবেন?’ (সুরা নিসা: ১৪৭)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)

শুকরিয়া শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করাও শুকরিয়ার অংশ।

বড় কোনো বিপদ থেকে মুক্তির পর সেজদায়ে শুকরের বিষয়টিও ইসলামি ফিকহে আলোচিত হয়েছে। নবীজি (স.)-এর কাছে আনন্দের কোনো সংবাদ এলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়ায় সেজদা করেছেন- এমন বর্ণনা একাধিক বর্ণনায় রয়েছে। বিপদ থেকে নিরাপদে ফিরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নেক আমলে মনোযোগী হওয়া তাই সুন্দর আমল।

আরও পড়ুন: সুন্দর মৃত্যুর জন্য যেসব আমলের কথা বলা হয়েছে হাদিসে

তাওবার সুযোগ নিন

মৃত্যুর কথা খুব কাছে থেকে মনে পড়লে নিজের ভুলগুলোও অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে গুনাহকে এতদিন ছোট মনে হয়েছে, সেটিই তখন নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৮)

তাওবার অর্থ শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়। গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং আর ফিরে না যাওয়ার সংকল্প করাও এর অংশ। নামাজে অবহেলা থাকলে তা ঠিক করার চেষ্টা করা যায়। হারাম উপার্জন বা অন্যকোনো অন্যায় অভ্যাস থাকলে তা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

জীবন ফিরে পাওয়ার পর তাই পুরোনো ভুলে ফিরে না গিয়ে তাওবার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের পথ বেছে নেওয়াই মুমিনের জন্য কল্যাণকর।

মানুষের পাওনা মিটিয়ে দিন

মৃত্যুর কথা মনে পড়লে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাবও সামনে আসে। কারও ঋণ থাকলে তা পরিশোধের চেষ্টা করা যায়। কারও সম্পদ নিজের কাছে থাকলে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। কারও প্রতি অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়া যায়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্যকোনো জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। (সহিহ বুখারি: ২৪৪৯)

বান্দার হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সম্পদ বা অধিকার নিজের কাছে রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া মুমিনের জন্য বড় ঝুঁকির বিষয়। সুযোগ থাকা অবস্থায় এসব হিসাব মিটিয়ে নেওয়া তাই জরুরি।

আরও পড়ুন: মৃত্যুর আগে কী কী লক্ষণ দেখা যেতে পারে

সময়ের মূল্য বুঝুন

সুস্থ অবস্থায় মানুষ অনেক সময় সময়ের মূল্য বুঝতে পারে না। অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কা সেই উপলব্ধিকে বদলে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত- সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪১২)

সুস্থ শরীর ও হাতে থাকা অবসর বড় নেয়ামত। ইবাদত, পরিবারের দায়িত্ব, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং মানুষের উপকার- এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় দেওয়া আর পিছিয়ে রাখার বিষয় নয়।

মৃত্যুর স্মরণ আখেরাতের প্রস্তুতি বাড়াক

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৮৫)

মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে হতাশ করার জন্য নয়। এটি দুনিয়ার জীবনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে। সম্পদ, পদ বা সামাজিক মর্যাদা একসময় পেছনে পড়ে থাকবে। মানুষের সঙ্গে থাকবে তার আমল।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (জামে তিরমিজি: ২৪৫৯)

মৃত্যুর ভয়কে তাই আতঙ্কে আটকে না রেখে আখেরাতের প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

অন্যের জন্যও জীবনকে অর্থবহ করুন

জীবন ও সুস্থতার মূল্য বুঝলে অন্যের কষ্টও নতুনভাবে অনুভব করা যায়। বিপদে পড়া কাউকে সাহায্য করা, অসুস্থ মানুষের খোঁজ নেওয়া, অভাবীকে সহযোগিতা করা কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা- এসব কাজ জীবনের সময়কে অর্থবহ করে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কোনো কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

আল্লাহ কাউকে জীবন ও সুস্থতা দিয়েছেন। সেই নেয়ামতের একটি সুন্দর ব্যবহার হলো অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করা।

মৃত্যুর খুব কাছে গিয়ে ফিরে আসা কাউকে যে নিশ্চিতভাবে ‘আরেকটি সুযোগ’ দেওয়া হয়েছে-এমন কথা শরিয়তের দলিল ছাড়া বলা ঠিক নয়। তবে যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ তাওবার দরজা খোলা এবং নেক আমলের সুযোগ রয়েছে। তাই মৃত্যুর অপেক্ষা নয়, প্রস্তুতিটাই হোক অগ্রাধিকার। হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- আরেকটি সকাল পাওয়া মানেই আরেকবার সুযোগ পাওয়া।

তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ১৪৭; সুরা ইবরাহিম: ৭; সুরা তাহরিম: ৮; সুরা জুমার: ৫৩; সুরা আলে ইমরান: ১৮৫; সহিহ বুখারি: ২৪৪৯, ৬৪১২; সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯; সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিজি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর