মক্কার মানুষ তখনও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর নবুয়ত স্বীকার করেনি। অনেকে তাঁর বিরোধিতা করেছে, তাঁকে কষ্ট দিয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রও করেছে। কিন্তু এসব বিরোধিতার মধ্যেও তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারির প্রতি মানুষের আস্থা অটুট ছিল। নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে চিনত।
তাঁর কাছে মানুষ নিজেদের সম্পদ আমানত রাখত। এমনকি হিজরতের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও অন্যের গচ্ছিত সম্পদের ব্যাপারে তিনি দায়িত্বশীল ছিলেন। তাঁর জীবনের এই দিকটি দেখিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত বিরোধ কখনো মানুষের অধিকার নষ্ট করার অনুমতি দেয় না।
‘আল-আমিন’ ছিল তাঁর পরিচয়
নবুয়ত লাভের আগেই মহানবী (স.)-এর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা মক্কার মানুষের কাছে সুপরিচিত ছিল। তাঁর জীবনে মিথ্যা, প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতার মতো কোনোকিছু দেখা যায়নি। তাই তাঁকে তারা ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত সবাই।
তাঁর বিরোধীদের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিগত সত্যবাদিতা সম্পর্কে স্বীকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়। আবু জেহেলের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না, তবে তুমি যা নিয়ে এসেছ, আমরা তা অস্বীকার করি।’ অর্থাৎ তাদের বিরোধিতা ছিল তাঁর দাওয়াত ও বার্তার প্রতি, তাঁর ব্যক্তিগত সত্যবাদিতা নিয়ে নয়।
এখানেই মহানবী (স.)-এর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। মানুষ তাঁর মত ও বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে পারে, কিন্তু তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা ছিল এমন এক গুণ, যা বিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারত না।
আরও পড়ুন: দুর্বলের অধিকার আদায়ে রাসুল (স.)-এর ৮ অভূতপূর্ব পদক্ষেপ
হিজরতের সময়ও আমানত রক্ষা
মক্কায় মহানবী (স.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। এমন সংকটময় সময়েও তিনি মানুষের আমানতের কথা ভুলে যাননি।
তাঁর কাছে মক্কার মানুষের যেসব সম্পদ গচ্ছিত ছিল, সেগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে তিনি হিজরত করেন। হজরত আলী (রা.)-কে মক্কায় অবস্থান করে আমানতগুলো তাদের মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। (সুনানে বায়হাকি: ১২৮২০)
ঘটনাটির তাৎপর্য এখানেই যে, আমানতের মালিকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় বিরোধ থাকলেও তাঁদের সম্পদের অধিকার নষ্ট হয়নি। শত্রুতা তাঁকে আমানতের ব্যাপারে অন্যায় করার সুযোগ দেয়নি।
কারও সম্পদ তাঁর কাছে গচ্ছিত থাকলে তা যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়া তাঁর নৈতিক দায়িত্ব ছিল। সম্পর্কের ভালো-মন্দ সেই দায়িত্বকে পরিবর্তন করেনি।
শত্রুতার ঊর্ধ্বে ছিল ন্যায়
মহানবী (স.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও তার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা শত্রুতা কাউকে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার অধিকার দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা: ৫৮)
এই আয়াত আমানতদারির একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে। আমানত যার, তা তার কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে সে আপনার ঘনিষ্ঠ হোক কিংবা বিরোধী, তার অধিকার নষ্ট করা যাবে না।
আরও পড়ুন: ইনসাফ শান্তির ভিত্তি
আমানত শুধু টাকা-পয়সার নয়
ইসলামে আমানতের অর্থ শুধু অর্থ-সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়। কারও গচ্ছিত সম্পদ সংরক্ষণ করা যেমন আমানত, তেমনি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং কারও ব্যক্তিগত কথা বা গোপনীয়তা রক্ষা করাও আমানতদারির অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘এবং যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে যত্নবান।’ (সুরা মুমিনুন: ৮)
অন্যদিকে মহানবী (স.) আমানতের খেয়ানতকে মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৪)
অর্থাৎ আমানতদারি শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি একজন মুমিনের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজকের সমাজে আমানতদারির শিক্ষা
বর্তমান সমাজে মানুষের অন্যতম বড় সংকট আস্থার সংকট। ব্যবসায়িক লেনদেন, কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক দায়িত্ব; প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ এমন কাউকে খোঁজে, যার ওপর নির্ভর করা যায়।
মহানবী (স.)-এর জীবন থেকে আমরা শিখি- বিশ্বাসযোগ্যতা একজন মানুষের বড় সম্পদ। কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তার অধিকার নষ্ট করা যাবে না। বিরোধ থাকলেও তার আমানতের খেয়ানত করা যাবে না।
কারও কাছে টাকা-পয়সা গচ্ছিত থাকলে তা যথাযথভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে। কোনো দায়িত্ব অর্পিত হলে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। কারও ব্যক্তিগত কথা জানলে তা রক্ষা করতে হবে। মানুষের সঙ্গে বিরোধ হলেও ন্যায় ও আমানতদারির সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
যে আস্থা আজও শিক্ষার
মহানবী (স.)-এর নবুয়তের আগেই ‘আল-আমিন’ পরিচয় তাঁর চরিত্রের যে আস্থার ভিত্তি তৈরি করেছিল, তা তাঁর পরবর্তী জীবনেও অটুট ছিল। হিজরতের মতো কঠিন সময়েও অন্যের আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সেই চরিত্রেরই প্রকাশ।
মানুষের সঙ্গে মতের বিরোধ থাকতে পারে, সম্পর্কের টানাপোড়েনও হতে পারে। কিন্তু অন্যের অধিকার ও আমানতের ক্ষেত্রে ন্যায় থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নবীজি (স.)-এর আমানতদারির এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাও একজন মানুষের বড় নৈতিক দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ৫৮; সুরা মুমিনুন: ৮; সহিহ বুখারি: ৩৪; সুনানে বায়হাকি; সুনানে কুবরা: ১২৮২০; ইবনু হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ



