নবীজি (স.) ছিলেন শিশুদের প্রতি গভীর মমতাশীল। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে শিশুদের আদর করা, তাদের স্নেহ দেওয়া এবং অনুভূতির মূল্য দেওয়া ছিল তাঁর মহান চরিত্রের অংশ। তবে যে সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে অনেকে অপমান ও দুর্ভাগ্যের কারণ মনে করত, সেখানে কন্যাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলামপূর্ব আরব সমাজে কন্যাসন্তানকে ঘিরে ছিল গভীর বৈষম্য ও নিষ্ঠুরতা। কোরআন সেই মানসিকতার চিত্র তুলে ধরে বলেছে, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। সে লোকদের কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে এই সুসংবাদের দুঃখে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, নাকি তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে।’ (সুরা নাহল: ৫৮-৫৯)
এই অন্ধকার মানসিকতার বিপরীতে ইসলাম কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানের অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মহানবী (স.) নিজের জীবন ও আচরণের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন, কন্যা কোনো বোঝা নয়। সে পরিবারের স্নেহ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকারী।
ফাতিমা (রা.) ছিলেন নবীজির অত্যন্ত প্রিয়
কন্যার প্রতি পিতার ভালোবাসা ও সম্মান কেমন হওয়া উচিত, মহানবী (স.) নিজের জীবনেই তার সুন্দর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে যেতেন, তাঁকে চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। আবার নবীজি (স.) তাঁর কাছে গেলে ফাতিমা (রা.) উঠে তাঁকে অভ্যর্থনা করতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৫২১৭)
ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি তাঁর গভীর মমতার আরেকটি দিক ফুটে ওঠে তাঁর এই বক্তব্যে, ‘ফাতিমা আমার একটি টুকরা। যা তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭১৪)
পিতা-কন্যার এই সম্পর্ক শুধু আবেগের বিষয় ছিল না। এর মধ্য দিয়ে নবীজি (স.) সমাজকে শিখিয়েছেন, কন্যাকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া একজন পিতার সুন্দর চরিত্রের অংশ।
আরও পড়ুন: কন্যাসন্তানের কারণে মা-বাবা যে মর্যাদা লাভ করবেন
কন্যা লালন-পালনে জান্নাতের সুসংবাদ
কন্যাসন্তানকে যত্ন ও মমতায় বড় করার মর্যাদা বোঝাতে মহানবী (স.) দিয়েছেন অনন্য সুসংবাদ। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কেয়ামতের দিন আমি এবং সে এ দুটির মতো থাকব।’ এ কথা বলার সময় তিনি হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন। (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)
যে সমাজে কন্যার জন্মকে দুঃখের কারণ মনে করা হতো, সেখানে কন্যাকে স্নেহ ও যত্নে লালন-পালনের জন্য রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এমন সুসংবাদ ছিল সমাজ পরিবর্তনের এক গভীর আহ্বান। এতে বোঝা যায়, একটি কন্যাকে ভালোভাবে মানুষ করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনাতেও কন্যার প্রতি মমতার এই শিক্ষা ফুটে ওঠে। এক নারী তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে আয়েশা (রা.)-এর কাছে সাহায্য চাইলে তাঁর কাছে দেওয়ার মতো একটি খেজুর ছাড়া কিছুই ছিল না। নারীটি খেজুরটি দুই মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন এবং নিজে কিছু খাননি। পরে নবীজি (স.) এ ঘটনা শুনে বলেন, ‘যাকে কন্যাসন্তান দিয়ে কোনোভাবে পরীক্ষা করা হয়, অতঃপর সে তাদের প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তারা তার জন্য আগুন থেকে আড়াল হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৫৪৩; সহিহ বুখারি: ১৪১৮, ৫৯৯৫)
কন্যা শুধু দায়িত্ব নয়, আল্লাহর দেওয়া আমানত
কন্যাসন্তানের প্রতি মমতা মানে শুধু খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করা নয়। তার নিরাপত্তা, শিক্ষা, সুন্দর চরিত্র গঠন, আত্মমর্যাদা ও অধিকার নিয়েও যত্নশীল হওয়া জরুরি। একটি শিশুকে এমনভাবে বড় করা প্রয়োজন, যাতে সে নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে না করে।
মহানবী (স.) শিশুদের প্রতি দয়া ও স্নেহকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (জামে তিরমিজি: ১৯১৯)
তাঁর এই শিক্ষা ছেলে-মেয়ে উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কন্যাসন্তানের প্রতি বিশেষ মমতার আলোচনা কোনোভাবেই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ভালোবাসার পার্থক্য তৈরি করে না। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো, যে সমাজে কন্যারা বিশেষভাবে অবহেলিত ছিল, সেখানে তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নবীজি (স.) সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
আরও পড়ুন: সন্তানের প্রতি মা-বাবার ১১ দায়িত্ব
বদলে দিলেন জাহেলিয়াতের মানসিকতা
ইসলামের আগে কন্যাসন্তানের জন্মে অনেকের মুখ অন্ধকার হয়ে যেত। কেউ কেউ জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম অপরাধেও জড়িয়ে পড়ত। ইসলাম সেই নিষ্ঠুর মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কন্যাকে লজ্জা বা বোঝা নয়, আল্লাহর দেওয়া সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষা দিয়েছে।
মহানবী (স.)-এর নিজের আচরণ ছিল সেই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। তিনি তাঁর কন্যাকে সবার সামনে সম্মান দিয়েছেন, ভালোবেসেছেন এবং তাঁর কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেছেন। একই সঙ্গে কন্যাসন্তানকে স্নেহ ও যত্নে লালন-পালনকারীদের জন্য দিয়েছেন আখেরাতের কল্যাণের সুসংবাদ।
আজও কোনো পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্ম হলে তাকে অবহেলা করা, ছেলের তুলনায় তার সুযোগ সীমিত করা কিংবা তাকে পরিবারের বোঝা মনে করা সেই জাহেলি মানসিকতারই ছায়া। নবীজি (স.)-এর শিক্ষা আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে বলে।
ভালোবাসাই হোক নববী আদর্শ
কন্যাসন্তানের প্রতি মমতা শুধু আবেগের বিষয় নয়। এটি পিতা-মাতার দায়িত্ব, একটি শিশুর অধিকার এবং নববী আদর্শের অংশ।
মহানবী (স.) এমন এক সমাজ গড়ার শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে শিশুর মর্যাদা তার লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কন্যাকে ভালোবাসতে হবে, তার যত্ন নিতে হবে, তাকে সুশিক্ষা দিতে হবে এবং সম্মানের সঙ্গে বড় করে তুলতে হবে।
যে সমাজ একসময় কন্যার জন্মকে অপমান মনে করত, নবীজি (স.) সেই সমাজকে শিখিয়েছেন, একটি কন্যাকে মমতায় বড় করাও আখেরাতের কল্যাণের কারণ হতে পারে। কন্যাসন্তান কোনো বোঝা নয়। সে আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাকে ভালোবাসা, যত্নে বড় করা, তার অধিকার নিশ্চিত করা এবং মর্যাদা রক্ষা করা মহানবী (স.)-এর দেখানো সুন্দর পথেরই অনুসরণ।




