মানুষ দোয়া করে। কখনো নিজের প্রয়োজনের জন্য, কখনো প্রিয়জনের জন্য, কখনো এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, যার কথা কাউকে বলা যায় না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একই প্রার্থনা করতে করতে একসময় মনে প্রশ্ন জাগে- এত দোয়া করেও যখন চাওয়া পূরণ হলো না, তাহলে কি দোয়া কবুল হয়নি?
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সরল নয়। বান্দা যে বিষয়টি চেয়েছে, ঠিক সেটিই তার হাতে তুলে দেওয়া হবে-এমন নয়। আল্লাহ বান্দার দোয়ার জবাব দেন তাঁর জ্ঞান ও হেকমত অনুযায়ী। কখনো কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি দেওয়া হয়, কখনো কোনো অকল্যাণ দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, আবার কোনো দোয়ার প্রতিদান আখেরাতের জন্য সঞ্চিত থাকে।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলিম এমন দোয়া করলে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন- হয় তার দোয়া দ্রুত কবুল করেন, অথবা তা আখেরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন, অথবা তার অনুরূপ কোনো অকল্যাণ তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন। সাহাবিরা বললেন, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আরও বেশি দানকারী।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১১১৩৩)
এই হাদিস দোয়ার ফলাফল সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনে। মানুষ সাধারণত দোয়ার উত্তরকে নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে দোয়ার জবাব সব সময় দৃশ্যমান কোনো প্রাপ্তির আকারে আসে না।
আরও পড়ুন: সবসময় এই ৫ দোয়া করুন, একটি কবুল হলেও জীবনে আর কিছু লাগবে না
চাওয়া পূরণ না হলেই দোয়া ব্যর্থ নয়
কেউ চাকরির জন্য দোয়া করলেন, কিন্তু চাকরিটি পেলেন না। কেউ কোনো সম্পর্কের জন্য দোয়া করলেন, কিন্তু সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত হলো না। কেউ একটি নির্দিষ্ট বিপদ থেকে মুক্তি চাইলেন, অথচ পরিস্থিতি তার প্রত্যাশামতো বদলাল না।
এসব ক্ষেত্রে মানুষের মনে সহজেই ধারণা তৈরি হতে পারে- দোয়া কবুল হয়নি।
কিন্তু কোরআন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, তার জ্ঞান সীমিত। আল্লাহ বলেন, ‘হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আবার হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয়কে পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা: ২১৬)
অর্থাৎ মানুষ যে বিষয়টিকে নিজের জন্য কল্যাণকর মনে করছে, তার প্রকৃত পরিণতি সে জানে না। আল্লাহ জানেন। তাই কোনো কিছু না পাওয়া মানেই আল্লাহ বান্দার দোয়া প্রত্যাখ্যান করেছেন-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
দোয়ার পথে নিজের কিছু বাধাও থাকতে পারে
দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বান্দার অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ও ধূলিমলিন অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করছে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দিয়ে লালিত হয়েছে। এরপর রাসুলুল্লাহ (স.) প্রশ্ন করেছেন, ‘তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
আরও পড়ুন: যে কারণে দোয়া মুখস্থ করা উচিত
হাদিসটি দোয়ার সঙ্গে হালাল জীবনের গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই দোয়া কবুলের আশা করার পাশাপাশি নিজের উপার্জন, খাদ্য, পোশাক ও জীবনযাপনের বৈধতা নিয়েও আত্মসমালোচনা করা জরুরি।
একজন মানুষ একদিকে দোয়া করছে, অন্যদিকে জেনে-শুনে হারাম উপার্জন করছে- এ অবস্থায় শুধু কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার অভিযোগ করলে নিজের অবস্থাটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দোয়া করতে করতে হতাশ হয়ে যাওয়া যাবে না
দোয়া কবুলে দেরি হলে অনেকেই একসময় দোয়া করা ছেড়ে দেন। কেউ কেউ বলেন, ‘অনেক দোয়া করেছি, কোনো ফল পাইনি।’
রাসুলুল্লাহ (স.) এমন তাড়াহুড়ো থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে বলে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)
এখানে শিক্ষা হলো, দোয়ার ফল দেরিতে আসছে দেখে আল্লাহর রহমত সম্পর্কে হতাশ হওয়া যাবে না। বান্দার কাজ হলো দোয়া করে যাওয়া এবং বৈধ উপায় অবলম্বন করা। ফলাফল কখন এবং কীভাবে আসবে, সেটি আল্লাহর ইলম ও হিকমতের বিষয়।
আরও পড়ুন: সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছোট দোয়া
দোয়া নিজেই একটি ইবাদত
দোয়ার গুরুত্ব শুধু এর মাধ্যমে কোনো প্রয়োজন পূরণ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর কাছে হাত তোলা নিজেই একটি ইবাদত।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দোয়া-ই ইবাদত।’ (জামে তিরমিজি: ২৯৬৯)
তাই কোনো মানুষ দোয়া করে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও তার দোয়া অর্থহীন হয়ে যায় না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা, নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করা এবং তাঁর ওপর নির্ভর করা এসবই ইবাদতের অংশ।
দোয়ারও কিছু আদব আছে
দোয়া করার সময় আল্লাহর প্রশংসা করা, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা এবং বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা করা উত্তম। দোয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, গুনাহের বিষয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য প্রার্থনা না করা এবং অধৈর্য হয়ে দোয়া ছেড়ে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে।’ (সুরা আরাফ: ৫৫)
অর্থাৎ দোয়া শুধু চাওয়ার ভাষা নয়, এটি বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্কেরও প্রকাশ।
তাহলে দোয়া কবুল হয়নি- এ কথা কখন বলব?
কোনো নির্দিষ্ট দোয়ার কাঙ্ক্ষিত ফল আমরা দেখিনি- এ কথা বলা যায়। কিন্তু সেখান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে দোয়া কবুল হয়নি।
কারণ মানুষ জানে না, তার কোনো দোয়ার মাধ্যমে কোন বিপদ দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে জানে না, কোনো প্রার্থনার প্রতিদান আখেরাতের জন্য কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আর সে এটাও জানে না, যে জিনিসটি সে প্রাণপণে চাইছে, সেটি পেলে তার জীবনে কী পরিণতি আসত।
তাই দোয়ার ক্ষেত্রে মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত- আমি চাইব, চেষ্টা করব, অপেক্ষা করব এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখব।
কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি পাওয়া গেলে আলহামদুলিল্লাহ। না পেলেও দোয়া থেমে যাবে না। কারণ বান্দা তার সীমিত জ্ঞান দিয়ে একটি ফল চায়, আর আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখেরাতের পূর্ণ পরিণতি জানেন।
হয়তো যে দরজাটি খুলে দেওয়ার জন্য বান্দা দীর্ঘদিন ধরে দোয়া করছে, সেটি তার জন্য কল্যাণকর নয়। আর যে কল্যাণ আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করেছেন, তার খবরও হয়তো সে এখনো জানে না।
তাই দোয়ার উত্তর চোখে দেখা যাচ্ছে না বলে দোয়া বন্ধ করে দেওয়া নয়। মুমিনের কাজ হলো- দোয়া করা, নিজেকে সংশোধন করা, হালাল পথে থাকা এবং আল্লাহর হিকমতের ওপর ভরসা রাখা।




