দোয়া মহান রবের কাছে বান্দার বিনীত প্রার্থনা, নির্ভরতা ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ। এটি মুমিনের শ্রেষ্ঠ ইবাদতগুলোর একটি। দোয়ার মাধ্যমেই বান্দা মহান আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানিত কোনো কিছু নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮২৯)
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)
কোরআন ও হাদিসে এমন কয়েক শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের দোয়া বিশেষভাবে কবুল হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
দোয়া কখনও বিফলে যায় না
অনেক সময় মানুষ মনে করেন, তাঁর দোয়া কবুল হয়নি। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, কোনো মুসলিম পাপের জন্য কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দোয়া না করলে আল্লাহ তাঁর দোয়ার তিনটি প্রতিদানের একটি দান করেন। হয় তিনি সঙ্গে সঙ্গে দোয়া কবুল করেন, অথবা তার প্রতিদান আখেরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন, কিংবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ দূর করে দেন। (মুসনাদে আহমদ: ১১১৩৩)
যাদের দোয়া দ্রুত কবুল হয়
১. মজলুম বা নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া
অন্যায়ের শিকার মানুষের দোয়া আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করবে। কেননা তার ফরিয়াদ ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা থাকে না।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৪৮)
আরও পড়ুন: মাজলুমকে সাহায্য না করলে যে শাস্তি পেতে হবে
২. নিরুপায় বা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির দোয়া
চরম বিপদে পড়ে যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহবানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন।’ (সুরা নামল: ৬২)
৩. সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া
সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) ইরশাদ করেন, তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়: ১. মা-বাবার দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া, ৩. মাজলুমের দোয়া। (তিরমিজি: ১৯০৫)
এ কারণে সন্তানের দায়িত্ব বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। একই সঙ্গে বাবা-মায়েরও উচিত রাগ বা আবেগের বশে সন্তানের জন্য বদদোয়া না করা।
৪. রোজাদারের দোয়া
রোজা ইবাদতের পাশাপাশি দোয়া কবুলেরও বিশেষ সময়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. রোজাদার যখন ইফতার করে। ২. ন্যায়পরায়ণ শাসক। ৩. মজলুমের দোয়া।’ (তিরমিজি: ২৫২৫)
আরও পড়ুন: ইফতার ও সাহরির সময়ের ৫ গুরুত্বপূর্ণ দোয়া
৫. মুসাফিরের দোয়া
সফররত ব্যক্তির দোয়াও আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তিনটি দোয়া মাকবুল- মাজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, সন্তানের জন্য তার পিতার দোয়া। (সুনানে তিরমিজি: ৩৪৪৮)
৬. অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া
অসুস্থ বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন কোনো রোগীর কাছে যাবে, তখন তার কাছে তোমাদের জন্য দোয়া চাইবে। কেননা তার দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৪১)
৭. অনুপস্থিত মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া
কোনো মুসলিম যখন তাঁর কোনো ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করেন, তখন ফেরেশতারা বলেন, ‘আমিন। তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩২)
দোয়া কবুলের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও আদব
হালাল উপার্জন
হালাল জীবিকা দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত। রাসুলুল্লাহ (স.) সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে বলেন, ‘তোমার খাদ্য হালাল করো, তাহলে তোমার দোয়া কবুল হবে।’ (আল-মুজামুল আওসাত: ৬৪৯৫)
হামদ ও দরুদ পাঠ
দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব। এক ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ না করে দোয়া করলে নবী (স.) তাকে তাড়াহুড়া না করে সঠিক নিয়মে দোয়া করার নির্দেশ দেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮১; সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৭)
পাপের জন্য দোয়া না করা
যে দোয়ায় পাপের বিষয় থাকে অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার আবেদন থাকে, সেই দোয়া কবুল করা হয় না। (মুসনাদে আহমদ: ১১১৩৩)
ধৈর্য ধারণ
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়ে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, আমি তো দোয়া করলাম, কিন্তু কবুল হলো না।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৪০)
দোয়া প্রয়োজন প্রকাশের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও নির্ভরতার বহিঃপ্রকাশ। কোরআন ও হাদিসে যাঁদের দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ এসেছে, তাঁদের গুণাবলি নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: সুরা গাফির: ৬০; সুরা নামল: ৬২; সহিহ বুখারি: ২৪৪৮, ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ২৭৩২; সুনানে তিরমিজি: ১৯০৫, ২৫২৫, ৩৪৪৮, ৩৪৭৭; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৪১, ৩৮২৯; সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮১; মুসনাদে আহমদ: ১১১৩৩




