রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নেতৃত্বের মোহ কেন ভয়ংকর? রাসুল (স.)-এর সতর্কবার্তা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নেতৃত্বের মোহ কেন ভয়ংকর? রাসুল (স.)-এর সতর্কবার্তা

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব অপরিহার্য। ইসলাম যোগ্য ও আমানতদার ব্যক্তির নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত মর্যাদা, ক্ষমতা বা পদলাভের মাধ্যম হিসেবে দেখাকে নিরুৎসাহিত করেছে। কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেতৃত্বকে একটি বড় আমানত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার প্রতিটি দায়িত্বের জবাবদিহি একদিন আল্লাহর কাছে করতে হবে।

নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া নিষেধ

আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) আমাকে বলেছেন, ‘হে আবদুর রহমান! তুমি কখনো নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না। কারণ, তুমি যদি চেয়ে নেতৃত্ব লাভ করো, তাহলে তোমাকে সেই দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। আর যদি না চাইতে দায়িত্ব পাও, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে সাহায্য করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৪৭)

আলেমদের ব্যাখ্যায়, এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো- ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা মানুষের আত্মনির্ভরতার অনুভূতি ও পদলিপ্সার পরিচয় বহন করতে পারে। পক্ষান্তরে কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছা ছাড়াই দায়িত্ব পান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা পালন করেন, তাহলে আল্লাহ তাকে সেই দায়িত্ব পালনে সাহায্য করেন।

পদপ্রার্থীর হাতে দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশ

আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার কওমের দু’ব্যক্তি নবী (স.)-এর নিকট আসলাম। সে দু’জনের একজন বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে (কোনো বিষয়ে) আমির নিযুক্ত করুন। অন্যজনও ওইরূপ বললো। তখন তিনি বললেন- যারা নেতৃত্ব চায় এবং এর লোভ করে, আমরা তাদেরকে এ পদে নিয়োগ করি না। (সহিহ বুখারি: ৭১৪৯)

আরও পড়ুন: সৎ নেতা বাছাইয়ের অলৌকিক ফল: আল্লাহর রহমত নেমে আসে ৫ ভাবে

আলেমদের ব্যাখ্যায়, এই হাদিসের শিক্ষা হলো- নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তির যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও তাকওয়াই মুখ্য। শুধু পদ পাওয়ার আগ্রহ বা আবেদন কাউকে নেতৃত্বের উপযুক্ত প্রমাণ করে না।

ক্ষমতার মোহ কেন ভয়ংকর?

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা নিশ্চয়ই নেতৃত্বের লোভ করো, অথচ কেয়ামতের দিন তা লজ্জার কারণ হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৪৮)

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে মানুষ সম্মান, প্রভাব ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু সেই দায়িত্বের যথাযথ জবাবদিহি করতে না পারলে আখেরাতে তা লজ্জা ও শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (ফাতহুল বারি)

নেতৃত্ব একটি আমানত

আবু জর গিফারি (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব চেয়েছিলেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘হে আবু জর! তুমি দুর্বল। আর এটি একটি আমানত। কেয়ামতের দিন এটি লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হবে। তবে যে ব্যক্তি যথাযথভাবে এর দায়িত্ব পালন করবে, তার বিষয়টি ভিন্ন।’ (সহিহ মুসলিম: ১৮২৫)

আরও পড়ুন: কেয়ামতে আপনার নেতার নামে ডাক পড়বে! জেনে নিন কীভাবে বাঁচবেন

আলেমদের ব্যাখ্যায়, এই হাদিস স্পষ্ট করে যে নেতৃত্ব কোনো মর্যাদার প্রতীক বা বিশেষ সুবিধা ভোগের সুযোগ নয়। এটি এমন একটি আমানত, যার প্রতিটি দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের জবাবদিহি আল্লাহর কাছে করতে হবে।

ইসলাম কি নেতৃত্ব নিরুৎসাহিত করে?

ইসলাম নেতৃত্বকে নিরুৎসাহিত করে না। নিরুৎসাহিত করে নেতৃত্বের মোহ, ক্ষমতার লোভ এবং পদলিপ্সাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)

এই আয়াতের আলোকে আলেমরা বলেন, দায়িত্ব সেই ব্যক্তির হাতেই অর্পণ করা উচিত, যিনি যোগ্য, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ এবং তা পালনে সক্ষম।

এ কারণেই ইসলামি ইতিহাসে নবী-রাসুল, খোলাফায়ে রাশেদিন এবং ন্যায়পরায়ণ শাসকদের নেতৃত্ব অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাঁরা ক্ষমতার মোহে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের হক আদায়ের দায়িত্ববোধ থেকে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

একজন মুসলমানের করণীয়

কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে একজন মুসলমানের করণীয় হলো-

  • নেতৃত্ব বা ক্ষমতার প্রতি ব্যক্তিগত লোভ থেকে বিরত থাকা।
  • দায়িত্ব পেলে তা আল্লাহর অর্পিত আমানত হিসেবে পালন করা।
  • যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ ও আমানতদার ব্যক্তিকে নেতৃত্বের দায়িত্বে সমর্থন করা।
  • নেতৃত্বকে মর্যাদা বা সুবিধা অর্জনের উপায় নয়, বরং জবাবদিহিমূলক দায়িত্ব হিসেবে দেখা।

অতএব, ইসলামে নেতৃত্ব কোনো মর্যাদার প্রতীক নয়, বরং একটি বড় আমানত। তাই ব্যক্তিগত পদলিপ্সা নয়, যোগ্যতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতিকেই ইসলাম প্রাধান্য দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সহিহ হাদিসগুলোও নেতৃত্বের মোহ থেকে বিরত থেকে দায়িত্বকে আমানত হিসেবে পালনের শিক্ষা দেয়।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৭১৪৭, ৭১৪৮, ৭১৪৯; সহিহ মুসলিম: ১৮২৫; সুরা নিসা: ৫৮; ফাতহুল বারি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর