ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রশান্তির বিষয়গুলো ইসলাম অস্বীকার করেনি। নীতিমালার মধ্যে রেখে বৈধ ও উপকারী খেলাগুলোকে উৎসাহ দিয়েছে। খেলাধুলা এর বাইরে নয়। তবে খেলাধুলা কখনোই জীবনের লক্ষ্য নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে তা হবে ইবাদত, দায়িত্ব ও আখিরাতমুখী জীবনের সহায়ক মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘তারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনূন: ৩)
বিজ্ঞাপন
ইসলামে খেলাধুলার নীতিগত অবস্থান
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে খেলাধুলা সাধারণত তিনটি অবস্থায় বিভক্ত-
হারাম বা নিষিদ্ধ: যেসব খেলায় জুয়া, সতর উন্মুক্ততা, নামাজ নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনো হারাম উপাদান রয়েছে
অপছন্দনীয়: যেসব খেলা দ্বীনি দায়িত্বে উদাসীনতা সৃষ্টি করে
বিজ্ঞাপন
বৈধ ও প্রশংসিত: যেসব খেলা শরীরচর্চা, দক্ষতা অর্জন ও বৈধ উদ্দেশ্যে করা হয় এবং শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে না
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক এমন জিনিস, যাতে আল্লাহর স্মরণ নেই তা অর্থহীন বা ভুল, তবে চারটি বিষয় ছাড়া। তা হলো, দুই লক্ষ্যের মাঝে চলা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে হাসি-কৌতুক করা, সাঁতার শেখা।’ (সুনানে কুবরা লিল-নাসায়ি: ৮৯৪০)
আরও পড়ুন: ইসলামে গেম খেলা কতটা গ্রহণযোগ্য
নবীজি (স.)-এর অনুমোদিত ও উৎসাহিত খেলাধুলা
হাদিস ও সীরাতের আলোকে কিছু খেলাধুলা পাওয়া যায়, যেগুলো নবীজি (স.) উৎসাহ দিয়েছেন বা অনুমোদন করেছেন। এগুলো মূলত শারীরিক প্রশিক্ষণ, আত্মরক্ষা এবং পারিবারিক সৌহার্দ্যের সাথে সম্পর্কিত।
১. তীর নিক্ষেপ (আর্চারি)
তৎকালীন যুগে তীর নিক্ষেপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ প্রশিক্ষণ। নবীজি (স.) বলেন- ‘তোমরা তীর নিক্ষেপ করো ও ঘোড়দৌড় শিখো।’ (সহিহ মুসলিম) তিনি আরও বলেন, একটি তীরের মাধ্যমে তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে- নির্মাতা, নিক্ষেপকারী ও সহায়ক।
২. ঘোড়দৌড় ও অশ্বচালনা
ঘোড়দৌড় ছিল সাহস ও যুদ্ধপ্রস্তুতির অংশ। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (স.) প্রশিক্ষিত ঘোড়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ২৮৭০)
৩. সাঁতার শেখা
রাসুলুল্লাহ (স.) সাঁতার শেখাকে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সুনানে নাসায়ি: ৮৯৪০) এটি জীবনরক্ষাকারী একটি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।
আরও পড়ুন: টাকার লেনদেন ছাড়া কার্ড খেলা কি জায়েজ?
নবীজি (স.) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। এটি পারিবারিক সম্পর্ককে আনন্দময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাখার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত।
৫. কুস্তি বা মল্লযুদ্ধ
সীরাত অনুযায়ী, নবীজি (স.) মক্কার বিখ্যাত মল্লযোদ্ধা রুকানাকে কুস্তিতে পরাজিত করেছিলেন। এটি শারীরিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ।
৬. পশু প্রশিক্ষণ ও লক্ষ্যভেদ অনুশীলন (আর্চারি/ঘোড়ার প্রশিক্ষণ)
ঘোড়া ও অন্যান্য বাহনকে প্রশিক্ষণ দেওয়াকে হাদিসে বৈধ ও উপকারী কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনানে নাসায়ি: ৮৯৪০)
খেলাধুলার ইসলামি শিক্ষা
ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলার উদ্দেশ্য হতে পারে-
- শরীরচর্চা ও সুস্থতা
- দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ অর্জন
- আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি
- পারিবারিক আনন্দ ও সম্পর্ক দৃঢ়করণ
- মানসিক প্রশান্তি
তবে শর্ত হলো- খেলাধুলা যেন নামাজ, ইবাদত বা নৈতিক দায়িত্বে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে এবং কোনো হারাম উপাদান এতে যুক্ত না থাকে।
ইসলাম খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করেনি, আবার অন্ধ বিনোদনকেও উৎসাহ দেয়নি। বরং দিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা। নবীজি (স.)-এর জীবন থেকে আমরা শিখি- শক্তি, শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও পারিবারিক আনন্দ সবই ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে অর্জন করা সম্ভব।




