সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমা। ইসলামি শরিয়তে এ দিনটিকে মুসলমানদের ‘সাপ্তাহিক ঈদ’ বলা হয়েছে। কোরআন-হাদিসে এ দিনের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। তবে বর্তমানে জুমার দিনটি অনেকের কাছে কেবল দু’রাকাত নামাজ ও গোসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.) এ দিনকে ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলের নির্দেশনা দিয়েছেন, যা সময়ের বিবর্তনে আজ প্রায় বিস্মৃত।
নিচে দলিলের ভিত্তিতে জুমার দিনের সেই উপেক্ষিত সুন্নতগুলো তুলে ধরা হলো-
১. ফজরের নামাজে বিশেষ দুই সুরা তেলাওয়াত
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) জুমার দিনে ফজরের নামাজে সুরা সিজদা এবং সুরা ইনসান তিলাওয়াত করতেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১০৭৪)
বর্তমানে অনেক স্থানে এ সুন্নতের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত।
২. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া
খুতবা শুরুর কিছুক্ষণ আগে মসজিদে পৌঁছানো এখন সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, সওয়াব তত বেশি।
রাসুল স. বলেন, ‘জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন। এবং ক্রমানুসারে আগে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি মোটাতাজা উট কোরবানি করে। এরপর যে আসে সে ওই ব্যক্তি, যে একটি গাভী কোরবানি করে। অতঃপর মেষ কোরবানি করার ন্যায়। এরপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগি দানকারীর ন্যায়। তারপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। তারপর ইমাম যখন বের হন, তখন ফেরেশতাগণ তাদের লেখা বন্ধ করে দেন এবং মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনতে থাকেন। (সহিহ বুখারি: ৯২৯)
আরও পড়ুন: খুতবার সময় একটি ‘টু শব্দ’ কেড়ে নিতে পারে জুমার ফজিলত
বিজ্ঞাপন
৩. পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া
বর্তমানে যানবাহনের সহজলভ্যতায় পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়ার অভ্যাস কমে গেছে। অথচ সুযোগ থাকলে পায়ে হেঁটে জুমার নামাজে যাওয়ার বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
হজরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসুল (স.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে পায়ে হেঁটে মসজিদে আসবে, ইমামের কাছাকাছি বসবে, এরপর মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং খুতবার সময় কোনো অনর্থক কথা বলবে না, সে মসজিদে আসার প্রতি কদমে একবছর রোজা ও নামাজের সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ: ৩৪৫)
৪. মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহার
সাবান বা টুথপেস্ট ব্যবহার করলেও মিসওয়াক একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র সুন্নত, যা অনেকেই আজ পালন করেন না।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, জুমার দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির গোসল ও মিসওয়াক করা কর্তব্য এবং সামর্থ্য থাকলে সে যেন সুগন্ধি ব্যবহার করে।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৪৬)
৫. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা
জুমার দিন নবীজির (স.)-এর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা বিশেষ সুন্নত। তবে ব্যস্ততা ও উদাসীনতার কারণে এ আমল অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জুমার দিন তোমরা আমার ওপর বেশি করে দরুদ পড়ো। কারণ তোমাদের দরুদগুলো আমার কাছে পেশ করা হয়। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল (স.)! কিভাবে আমাদের দরুদগুলো আপনার কাছে উপস্থাপন করা হবে, যখন আপনার শরীর জরাজীর্ণ হয়ে মিশে যাবে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, মহান আল্লাহ মাটির জন্য নবী-রাসুলদের দেহ (ভক্ষণ করা) হারাম করে দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ১০৪৭)
আরও পড়ুন: জুমার দিন দরুদ পড়ার ফজিলত
৬. সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল সুরা কাহাফ তেলাওয়াত। অনেকে এ সুন্নত জানলেও নিয়মিত আমল করতে পারেন না।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত হয়ে থাকবে।’ (সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকি: ৫৭৯৩)
৭. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকা
শুধু নিজে চুপ থাকাই যথেষ্ট নয়, পাশের কাউকে ‘চুপ করো’ বলাটিও জুমার সওয়াব ক্ষুণ্ণ করে। এ বিষয়টি অনেকেই জানেন না।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দেবেন, তখন তুমি যদি তোমার পাশের সঙ্গীকে বলো ‘চুপ করো’, তবে তুমি একটি অনর্থক কাজ করলে।’ (সহিহ বুখারি: ৯৩৪)
মোবাইল ফোন ব্যবহার, ফিসফিস করে কথা বলা ও অমনোযোগী থাকাও এ সুন্নতের পরিপন্থী।
৮. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত অনুসন্ধান করা
জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যখন কোনো দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; এ মহামূল্যবান সময়ের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ উদাসীন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই সময়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করেন।’ তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সেই সময়টি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)
অধিকাংশ আলেমের মতে, এ মুহূর্তটি আছরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।
জুমার দিনটি ইবাদত, তাওবা, জিকির ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সময়। হারিয়ে যাওয়া এই সুন্নতগুলো পুনরুজ্জীবিত করলে অনেক সওয়াব লাভ হবে, পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শকে জীবন্ত রাখাও সম্ভব হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে জুমার দিনের প্রতিটি সুন্নতের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




