ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও পরিমিত সৌন্দর্যচর্চা ইবাদতের অংশ। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে চুলের যত্ন নিতেন এবং সাহাবিদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। বর্তমানে প্রচলিত ‘৩ ধরনের চুল রাখা সুন্নত’ কথাটি মূলত হাদিসে বর্ণিত রাসুল (স.)-এর চুলের তিনটি দৈর্ঘ্যের বিবরণ থেকে এসেছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক স্টাইল নয়, বরং নবী (স.)-এর জীবনের বিভিন্ন সময়ের বাস্তব অবস্থার বর্ণনা।
হাদিসে বর্ণিত তিনটি দৈর্ঘ্য
হাদিসের গ্রন্থগুলোতে রাসুল (স.)-এর চুলের তিনটি অবস্থার কথা পাওয়া যায়, যেগুলো আলেমগণ আরবি পরিভাষায় চিহ্নিত করেছেন।
ওয়াফরাহ (وَفْرَة): কানের কাছাকাছি বা কান পর্যন্ত চুল। হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবী (স.) মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয়ে কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’ (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১; সহিহ মুসলিম: ২৩৩৭; আবু দাউদ: ৪১৮৫)
লিম্মাহ (لِمَّة): কানের নিচে থেকে কাঁধের কাছাকাছি পর্যন্ত চুল। হাদিসে এসেছে, রাসুল (স.)-এর চুল কান ও কাঁধের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছাত। (সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ: ৪১৮৭)
জুম্মাহ (جُمَّة): কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। বারাআ (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কারুকার্য খচিত লাল চাঁদর পরিহিত রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চেয়ে সুন্দর কোনো বাবরি চুল ওয়ালাকে দেখিনি। (আবু দাউদ: ৪১৮৩) হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘নবী (স.)-এর চুল কখনও কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হতো।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯০৩)
বিজ্ঞাপন
এই তিনটি বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা। রাসুল (স.) সবসময় একই দৈর্ঘ্যে চুল রাখেননি; বিভিন্ন সফর, হজ ও সাধারণ সময়ে চুলের দৈর্ঘ্য ভিন্ন ছিল। ফলে এই তিনটির যেকোনোটি রাখাই সুন্নাহর আওতাভুক্ত।
আরও পড়ুন: নবীজি চুলের যত্ন নিতেন যেভাবে
হলক ও তাকসির: হজ-ওমরার স্বতন্ত্র সুন্নাহ
হজ বা ওমরার সময় পুরো মাথা মুণ্ডন করা (হলক) বা চুল ছোট করা (তাকসির) শরিয়তে স্বতন্ত্র আমল হিসেবে প্রমাণিত। এ কারণে কিছু আলেম মোট চারটি ধরনের কথা উল্লেখ করেন। তবে এটি কোনো একক হাদিসে ‘চার সুন্নত স্টাইল’ হিসেবে একত্রে বর্ণিত হয়নি।
যা নিষিদ্ধ: কাজা
মাথার কিছু অংশ কামিয়ে অন্য অংশ রেখে দেওয়াকে ‘কাজা’ বলা হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) কাজা করতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯২১) অধিকাংশ আলেমের মতে, যে হেয়ারকাটে মাথার একাংশ অস্বাভাবিকভাবে ছোট এবং অন্য অংশ অস্বাভাবিকভাবে লম্বা রাখা হয়, তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
আরও পড়ুন: হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কি হারাম?
চুলের যত্নের সুন্নাহ
রাসুল (স.) চুলের যথাযথ যত্ন নিতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘যার চুল আছে, সে যেন তার যত্ন নেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪১৬৩) নিয়মিত চিরুনি করা, চুলে তেল ব্যবহার করা এবং চুল পরিষ্কার রাখা সুন্নাহ। উস্কোখুস্কো বা এলোমেলো রাখা অপছন্দনীয়।
ইসলামে চুলের ক্ষেত্রে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্টাইল বাধ্যতামূলক নয়। মূলনীতি হলো পরিচ্ছন্নতা, শালীনতা, অহংকারমুক্ততা এবং কাজা পরিহার করা। রাসুল (স.)-এর চুলের বর্ণিত তিনটি দৈর্ঘ্য- ওয়াফরাহ, লিম্মাহ ও জুম্মাহ- তাঁর বাস্তব জীবনের বিভিন্ন অবস্থার প্রতিফলন। একজন মুমিন এই সীমার মধ্যে যেকোনো দৈর্ঘ্যে চুল রাখতে পারেন এবং নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে সুন্নাহ পালনে সওয়াবের আশা করতে পারেন।




