দুই ঈদের নামাজ মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় ধর্মীয় আয়োজন। ঈদের নামাজের পর খুতবা প্রদান করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। তবে অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন জাগে- ঈদের খুতবা শোনা কি সুন্নত, নাকি ওয়াজিব? এ বিষয়ে ফকিহ ও আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও সবাই খুতবার গুরুত্বের বিষয়ে একমত।
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ঈদের নামাজ আদায়ের পর খুতবা দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, খুতবা চলাকালীন উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য নীরব থাকা ও মনোযোগ বজায় রাখা ওয়াজিব। তাই খুতবার সময় মুসল্লিরা নীরবে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবেন, এমনকি তাকবিরও বলবেন না।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে মূল দলিল হলো হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা। তিনি বলেন- وَجَبَ الْإِنْصَاتُ فِي أَرْبَعَةِ مَوَاطِنَ: الْجُمُعَةِ، وَالْفِطْرِ، وَالْأَضْحَى، وَالِاسْتِسْقَاءِ. ‘চারটি স্থানে চুপ থাকা ওয়াজিব: জুমা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং ইসতিসকার খুতবার সময়।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক, বর্ণনা: ৫৬৪২)
আরও পড়ুন: জুমার খুতবা নামাজের আগে, ঈদের খুতবা পরে—হেকমত কী
অন্যান্য মাজহাবের অনেক আলেম ঈদের খুতবা শোনাকে সুন্নত বলেছেন। একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘আমরা এখন খুতবা দেব। যার ইচ্ছা সে বসে খুতবা শুনবে, আর যে চলে যেতে চায় সে চলে যাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১১৫৫)
তবে হানাফি ফকিহরা এই হাদিসটিকে ঈদগাহে আসার বিষয়ে ঐচ্ছিকতার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, খুতবা শোনার বিধান হিসেবে নয়। কেননা একবার জামাতে উপস্থিত হলে চুপ থেকে খুতবা শোনা ওয়াজিব- - এটাই হানাফি ফকিহদের প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত।
বিজ্ঞাপন
নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত, তিনি নিয়মিত ঈদের নামাজের পর খুতবা দিতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন- ‘রাসুলুল্লাহ (স.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন বের হতেন এবং প্রথমে নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষ হলে তিনি মানুষের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতেন, তারা নিজ নিজ নামাজের স্থানে বসে থাকত এবং তিনি নাসিহা করতেন।’ (সহিহ বুখারি: ৯৫৬; সহিহ মুসলিম: ৮৮৯)
হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (স.) ঈদের খুতবা দাঁড়িয়ে দিতেন এবং দুটি খুতবার মাঝখানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১২৮৯)
আলেমদের মতে, ঈদের খুতবা মুসল্লিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিকনির্দেশনা বহন করে। ঈদুল ফিতরের খুতবায় রমজানের শিক্ষা ধরে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়। তাকওয়া, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় মুসল্লিদের।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)
আরও পড়ুন: ঈদুল আজহার দিন যা করতেন নবীজি (স.)
অন্যদিকে ঈদুল আজহার খুতবায় ত্যাগ, কোরবানি এবং হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর আনুগত্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমানি চেতনা আরও দৃঢ় হয়।
বিশেষজ্ঞ আলেমরা বলেন, ঈদের খুতবা মুসলিম সমাজের জন্য নৈতিক, সামাজিক ও সমসাময়িক দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। খুতবার মাধ্যমে মুসল্লিদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া হয়। জাকাত, ফিতরা, কোরবানির গোশত বণ্টন এবং অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়ও গুরুত্ব পায় এসব খুতবায়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটি শরীরের মতো; শরীরের এক অঙ্গ আক্রান্ত হলে পুরো শরীর জ্বর ও ব্যথায় কষ্ট পায়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১১)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর খুতবা না শুনে ঈদগাহ ত্যাগ করা অনুচিত। খুতবা চলাকালীন কথা বলা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা বা অন্য কাউকে বিরক্ত করা- এমনকি তাকবির বলা পর্যন্ত নিষিদ্ধ। কারণ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় স্পষ্ট, এই মুহূর্তে পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা ওয়াজিব। জুমার খুতবার মতো ঈদের খুতবাতেও একই আদব প্রযোজ্য বলে হানাফি ফকিহরা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
ধর্মবিদদের মতে, ঈদের খুতবার বাণী ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের মধ্যেই ঈদের তাৎপর্য নিহিত। তাই খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নির্দেশনা পালন করা প্রতিটি মুসল্লির কর্তব্য। তাই ঈদের আনন্দকে পরিপূর্ণ করতে খুতবার শিক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করার আহ্বান জানান আলেমরা।
মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ৫৬৪২; আলমাবসুত, সারাখসি: ২/৩৭; আলবাহরুর রায়েক: ২/১৬২; বাদায়েউস সানায়ে: ১/৬১৯; আদ্দুররুল মুখতার: ২/১৫৯; রদ্দুল মুহতার: ১/৫৪৫; সহিহ বুখারি: ৯৫৬; সহিহ মুসলিম: ৮৮৯; আবু দাউদ: ১১৫৫; ইবনে মাজাহ: ১২৮৯; সহিহ বুখারি: ৬০১১; সুরা বাকারা: ১৮৩




