ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই একটি পরিচিত বিতর্ক সামনে আসে- ‘পশুপ্রেম’ বা ‘অমানবিকতা’র যুক্তি তুলে কোরবানির বিরোধিতা। কিন্তু কোরআন, সুন্নাহ ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোরবানি কোনো উদ্দেশ্যহীন রক্তপাত নয়; বরং এটি স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য, মানবকল্যাণ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার একটি সুপরিকল্পিত বিধান।
কোরআনে পশু সৃষ্টির উদ্দেশ্য
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, গবাদিপশু মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘চতুস্পদ জন্তুগুলো তিনি সৃষ্টি করেছেন; তোমাদের জন্য তাতে শীত নিবারক উপকরণ ও বহু উপকার রয়েছে। আর সেগুলো থেকে তোমরা আহার্য গ্রহণ করো।’ (সুরা নাহল: ৫)
আল্লাহ তাআলা প্রাণিজগতকে মানবসভ্যতার কল্যাণের সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত করেছেন। পশুর গোশত মানুষের খাদ্য, দুধ পুষ্টির উৎস এবং চামড়া ও পশম ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত।
কোরবানির মূল দর্শন: রক্তপাত নয়, তাকওয়া
কোরবানি কোনো পাশবিক আনন্দ বা নিছক পশুহত্যার নাম নয়। আল্লাহ তাআলা এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করে বলেছেন- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ কোরবানির মূল লক্ষ্য হলো মানুষের আমিত্ব ও লালসাকে বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা।
আরও পড়ুন: কোরবানির পশু যত বড় সওয়াব কি তত বেশি?
পশুর অধিকার ও নবীজির নির্দেশনা
পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামে দয়া, পরিচ্ছন্নতা ও কষ্ট কমানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা যখন জবাই করবে, উত্তমভাবে জবাই করবে।’ (সহিহ মুসলিম)
এর পাশাপাশি আরও সুনির্দিষ্ট নিয়ম বর্ণিত হয়েছে- ছুরি অত্যন্ত ধারালো রাখতে হবে যাতে পশুর কষ্ট কম হয়; এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা যাবে না এবং পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া নিষেধ। পশুর প্রতি এই মাত্রার সংবেদনশীলতা ইসলামের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পশুস্বাস্থ্য
বিরোধীরা প্রায়ই জবাইয়ের দৃশ্যকে ‘নিষ্ঠুর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। জার্মানির হানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা বিভাগের গবেষক অধ্যাপক উইলহেম শুলৎজে (Wilhelm Schulze) ও তাঁর সহকর্মী ড. হাজিম (Dr. Hazim) পরিচালিত একটি গবেষণায় মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড স্থাপন করে হালাল জবাই ও স্টানিং পদ্ধতি তুলনা করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, সঠিক হালাল পদ্ধতিতে জবাইয়ের প্রথম কয়েক সেকেন্ডে পশু দ্রুত সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে স্টানিং পদ্ধতিতে মস্তিষ্কে তীব্র যন্ত্রণার তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়েছে।
এর কারণ হলো, ধারালো ছুরিতে দ্রুত জবাই করলে ঘাড়ের প্রধান রক্তনালি একসঙ্গে কেটে যায়, ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয় এবং পশু দ্রুত অচেতন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি সম্পূর্ণ রক্ত নিষ্কাশিত হওয়ায় মাংসে ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ কমে যায়, যা মাংসকে স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী করে।
আরও পড়ুন: কোরবানির পশু কেনার আগে যাচাই করুন এই ৭টি বিষয়
খাদ্যচক্র ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
প্রকৃতির খাদ্যচক্রে প্রাণীভক্ষণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি পশু-পাখি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জবাই হয়। সেই তুলনায় সারা বিশ্বে কোরবানির মোট সংখ্যা এই বার্ষিক বাণিজ্যিক জবাইয়ের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র।
এখানে একটি স্পষ্ট দ্বিমুখিতা লক্ষণীয়। যারা কোরবানিকে ‘নিষ্ঠুর’ বলেন, তাদের বড় অংশই সারাবছর নির্দ্বিধায় মুরগি, হাঁস বা মাছ খান এবং সেটি নিয়ে কোনো ‘পশুপ্রেম’ জাগ্রত হয় না। রেস্তোরাঁয় চিকেন ফ্রাই খাওয়ার সময় যে প্রাণীটি জবাই হয়েছে, সেটি কোরবানির গরুর চেয়ে কম ‘প্রাণী’ নয়। অথচ বিশ্বের বৃহৎ মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলোতে পশু কল্যাণের ন্যূনতম মান নিশ্চিত না করেই প্রতিনিয়ত কোটি কোটি প্রাণী জবাই হচ্ছে- যা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ খুব একটা দেখা যায় না।
পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, প্রাণিজ প্রোটিন মানবদেহের অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশ্বজুড়ে এখনো বিপুল জনগোষ্ঠী পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যেখানে প্রাণিজ প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য কোরবানির গোশত বছরের অন্যতম প্রধান পুষ্টির উৎস।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক মাত্রা
কোরবানি এমন ইবাদত, যাতে রয়েছে গভীর সামাজিক তাৎপর্য। ইসলামে কোরবানির গোশতের একটি বড় অংশ দরিদ্র ও অসহায়দের মাঝে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। ফলে সমাজের প্রান্তিক মানুষ বছরের এই সময়ে উন্নতমানের আমিষ খাওয়ার সুযোগ পায়। অর্থনৈতিকভাবেও কোরবানির পশুর প্রতিটি অংশ মানুষের কাজে আসে। পশুর চামড়া, হাড়, রক্ত ও অন্যান্য উপজাত বিভিন্ন শিল্প এবং জৈবসার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
মোটকথা, কোরবানি কোনো বর্বরতা নয়; এটি আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত ইবাদত, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবকল্যাণ, পুষ্টি ও সামাজিক ভারসাম্য। ইসলাম যেমন মানুষকে পশু ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তেমনি পশুর প্রতি দয়া ও কষ্ট কমানোর কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছে। অতএব, কোরবানিকে অমানবিক বলার আগে ইসলামের এই নৈতিক কাঠামো এবং বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা- তিনটি বিষয়ই সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।




