কোরবানির পশু জবাইয়ের আগমুহূর্তে অনেক সময় দেখা যায় চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্যটি দেখে সাধারণ মানুষের মনে নানা কৌতূহল ও আধ্যাত্মিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। অনেকে মনে করেন, পশু তার আসন্ন মৃত্যু দেখতে পেয়ে কাঁদছে; কেউবা একে অলৌকিক কোনো ঘটনার ইঙ্গিত মনে করেন। জনশ্রুতির বাইরে এ বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান এবং ইসলামের দালিলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: শারীরিক ও স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মানুষের মতোই অশ্রুগ্রন্থি থাকে। তবে মানুষের মতো কেবল দুঃখবোধ থেকে ‘আবেগময় কান্না’ করার ক্ষমতা প্রাণীদের আছে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পশুর চোখ দিয়ে অশ্রুসদৃশ তরল পড়ার পেছনে প্রধানত কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে-
১. তীব্র মানসিক চাপ ও ভয়: ‘কেমব্রিজ ডিক্লারেশন অন কনশাসনেস’ (২০১২) অনুযায়ী, প্রাণীরা মানুষের মতোই ভয় ও যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে। জবাইয়ের আগে অপরিচিত পরিবেশ, মানুষের ভিড় এবং রক্তের গন্ধে পশুর শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এই তীব্র ভীতি থেকে স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার কারণে চোখে অশ্রুসদৃশ তরল আসতে পারে।
২. ঘ্রাণ ও সংবেদনশীলতা: পশুর ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে অনেক তীব্র। অন্য পশুর রক্ত বা হাড়ের গন্ধ পেলে তারা বিপদের সংকেত পায় এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এটি তাদের টিকে থাকার সহজাত প্রবণতার একটি শারীরিক বহিঃপ্রকাশ।
৩. পরিবেশগত প্রভাব: ধুলোবালি বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে চোখের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং অস্বস্তি কমাতে প্রাকৃতিকভাবেই চোখে জল আসতে পারে।
আরও পড়ুন: কোরবানির দোয়া ও পশু জবাইয়ের নিয়ম
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: পশুর অনুভূতি ও অধিকার
ইসলাম ধর্ম পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগেই দিয়েছে। পশু যে কষ্ট এবং ভয় পায়, তা হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় সুস্পষ্ট।
১. পশুর প্রতিক্রিয়া ও নবীজির (স.) নির্দেশনা
সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) এক আনসারির বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট তাঁকে দেখে অস্থির হয়ে উঠল এবং তার চোখ দিয়ে জল ঝরল। নবীজি (স.) উটটির কাছে গেলে সেটি শান্ত হয়ে যায়। এরপর তিনি উটটির মালিককে ডেকে বললেন- ‘তুমি কি এই পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? সে আমার কাছে অভিযোগ করল যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং কষ্ট দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৯)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পশুরাও কষ্ট ও অবহেলা অনুভব করে এবং তা আচরণ ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে।
২. জবাইয়ের সময় ‘ইহসান’ বা দয়া
ইসলামের নির্দেশ হলো জবাইয়ের সময় পশুকে সর্বনিম্ন কষ্ট দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে তোমাদের ওপর ‘ইহসান’ (সদাচার) ফরজ করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা জবাই করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং তার পশুকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কোরবানির সময় পর্যন্ত পশুর যত্ন নেওয়ার ফজিলত
প্রচলিত কিছু ভ্রান্তি ও বাস্তবতা
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, ‘পশু মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখে বা জান্নাত দেখে কাঁদে’। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এ ধরনের কোনো নির্ভরযোগ্য ও সরাসরি বর্ণনা পাওয়া যায় না। পশু অদৃশ্য কিছু দেখে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে—এমন বিশ্বাসের কোনো সুনির্দিষ্ট শরয়ি ভিত্তি নেই। অদৃশ্য জগতের বিষয়গুলো কেবল ওহি বা দালিলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
পশুর ভয় দূর করতে ইসলামের বিধান
পশু যেন আতঙ্কিত না হয় বা ভয়ের কারণে তার চোখে জল না আসে, সেজন্য ইসলামি শরিয়তে কয়েকটি কাজ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে-
পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া: নবীজি (স.) এক ব্যক্তিকে পশুর সামনে ছুরি ধার দিতে দেখে রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কি তাকে দুইবার মারতে চাও?’ (মুসতাদরাক হাকেম: ৭৫৭০)
এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই: এটি পশুর মধ্যে অতিরিক্ত ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আলেমগণ এসব কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
নিষ্ঠুর আচরণ: জবাইয়ের স্থানে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া বা প্রহার করা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী।
জবাইয়ের আগে পশুর চোখ দিয়ে অশ্রুসদৃশ তরল পড়া মূলত ভয়, চাপ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রতি শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। পশুর কষ্ট ও অনুভূতির বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনাগুলো আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো পশুর প্রতি মানবিক হওয়া এবং পরম মমতায় শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে কোরবানি সম্পন্ন করা।
তথ্যসূত্র: কোরআন (১৭:৪৪, ২২:৩৭); সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫; আবু দাউদ: ২৫৪৯; মুসতাদরাক হাকেম: ৭৫৭০; ক্যামব্রিজ ডিক্লারেশন অন কনশাসনেস (২০১২)




