মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ঢাকা

জবাইয়ের আগে পশু মারা গেলে কোরবানি আদায় হবে কি?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

জবাইয়ের আগে পশু মারা গেলে কোরবানি আদায় হবে কি?

কোরবানির পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগ মুহূর্তে কখনো দেখা যায় পশুটি হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে কিংবা ছটফট করতে করতে মারা গেছে। প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে এ ধরনের ঘটনায় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়- পশুটি যদি ছুরি লাগার আগেই মারা যায়, তাহলে তার গোশত কি হালাল হবে? কোরবানি কি আদায় হবে? ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।

শরিয়তের মূলনীতি: জীবিত পশু জবাই হওয়া শর্ত

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী হালাল স্থলচর প্রাণী ভক্ষণের জন্য শরিয়তসম্মত জবাই অপরিহার্য। কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী।’ (সুরা মায়েদা: ৩)
ফকিহরা বলেন, যে পশুর মৃত্যু জবাইয়ের কারণে নয়, বরং অন্যকোনো কারণে- যেমন আঘাত, শক, স্ট্রোক বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঘটে, তা ‘মায়িতাহ’ বা মৃত জন্তু হিসেবে গণ্য হবে এবং তার গোশত খাওয়া জায়েজ হবে না। শরিয়তের মূল শর্ত হলো- পশুকে জীবিত অবস্থায় জবাই করতে হবে এবং জবাইয়ের ফলেই তার মৃত্যু হতে হবে।

ভয় বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হলে বিধান কী?

সমসাময়িক পশুচিকিৎসা গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত ভয়, তীব্র মানসিক চাপ, প্রচণ্ড গরম, অতিরিক্ত ধস্তাধস্তি বা শ্বাসরোধজনিত কারণে কিছু পশুর আকস্মিক মৃত্যু ঘটতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড কার্ডিয়াক ফেলিওর’ বলা হয়। 

আরও পড়ুন: পশু কেনার আগে নিয়ত না করলে কি কোরবানি হবে?


বিজ্ঞাপন


ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে এখানে মূল প্রশ্ন একটাই- ছুরি চালানোর সময় পশুটি জীবিত ছিল কি না। যদি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে পশুটি ছুরি চালানোর আগেই মারা গেছে, তাহলে সেই পশু হালাল হবে না এবং কোরবানিও আদায় হবে না। কারণ শরিয়তসম্মত জবাইয়ের মাধ্যমে মৃত্যু না হলে পশু ‘মৃত জন্তু’ হিসেবেই গণ্য হয়।

কীভাবে বোঝা যাবে পশুটি আগে মারা গেছে?

ফুকাহা ও পশুচিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন-
প্রথমত, রক্ত প্রবাহের ধরন। জীবিত পশু জবাই করলে রক্ত স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হয়। রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলে সন্দেহ তৈরি হতে পারে, তবে এককভাবে এটি চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; অন্যান্য লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শরীরের প্রতিক্রিয়া। জীবিত পশু জবাইয়ের পর স্বাভাবিকভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কম্পন বা নড়াচড়া দেখা যায়, যাকে ফিকহের ভাষায় ‘ইদতিরাব’ বলা হয়। মৃত পশুতে এ প্রতিক্রিয়া সাধারণত অনুপস্থিত থাকে।
তবে আলেমরা সতর্ক করেছেন- এসব লক্ষণ সহায়ক হলেও এগুলোর ওপর নির্ভর করে একা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সবসময় সম্ভব নয়। সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন: পশুর যেসব ত্রুটি থাকলেও কোরবানি সহিহ হবে

যদি প্রাণের সামান্য লক্ষণও থাকে?

অনেক সময় পশু অচেতন হয়ে পড়ে, কিন্তু পুরোপুরি মারা যায় না। শ্বাস চলা, চোখ নড়াচড়া করা, শরীরে সামান্য স্পন্দন থাকা বা রক্ত চলাচলের উপস্থিতি- এসব প্রাণের অস্তিত্বের লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। এ অবস্থায় যদি জবাইয়ের সময় প্রাণের এই সামান্য অস্তিত্বও বিদ্যমান থাকে এবং শরিয়তসম্মতভাবে জবাই সম্পন্ন করা হয়, তাহলে সেই পশু হালাল হবে। কারণ তখন পশুটি জীবিত অবস্থায় ছিল এবং জবাইয়ের মাধ্যমেই তার মৃত্যু সংঘটিত হয়েছে।

কোরবানির সময় নিষ্ঠুরতা কেন ঝুঁকি বাড়ায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশুকে অপ্রয়োজনীয় ভয় দেখানো, টেনে-হিঁচড়ে আনা, এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা, দীর্ঘ সময় রোদে বেঁধে রাখা বা ধারহীন ছুরি ব্যবহার করা- এসব কারণে পশুর ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (স.) এ বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি পশুকে শুইয়ে তার সামনেই ছুরি ধার দিচ্ছিল। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘তুমি কি পশুটিকে দুইবার মারতে চাও? তাকে শোয়ানোর আগেই ছুরি ধার করলে না কেন?’
এ ছাড়া সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সবকিছুর ক্ষেত্রে উত্তম আচরণ নির্ধারণ করেছেন। তোমরা যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করো; ছুরি ধারালো করো এবং পশুকে কষ্ট কম দাও।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫)

করণীয় কী?

আলেম ও বিশেষজ্ঞরা কোরবানির সময় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন: পশুকে শান্ত রাখা; ধারালো ছুরি আগেই প্রস্তুত রাখা; অন্য পশুর সামনে জবাই না করা; অপ্রয়োজনীয় ধস্তাধস্তি না করা; প্রচণ্ড গরমে পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা এবং দ্রুত জবাই সম্পন্ন করা।

মাসয়ালার সারসংক্ষেপ

ছুরি চালানোর আগেই মৃত্যু নিশ্চিত হলে পশু হালাল নয়, কোরবানিও আদায় হবে না। ছুরি চালানোর সময় প্রাণের যেকোনো লক্ষণ অবশিষ্ট থাকলে এবং শরিয়তসম্মত জবাই করা হলে পশু হালাল হবে। সন্দেহ থাকলে সতর্কতা অবলম্বন এবং বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিতে হবে।

কোরবানি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই এ ইবাদত পালনে শরিয়তের বিধান মানার পাশাপাশি পশুর প্রতি দয়া ও নববী আদব অনুসরণ করা অপরিহার্য। পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া যেমন ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী, তেমনি জবাইয়ের আগেই পশুর মৃত্যু ঘটলে কোরবানির বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং শরিয়তসম্মত পদ্ধতিই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর