মানুষের জীবন সবসময় সহজ পথে চলে না। কখনো এমন কঠিন পরিস্থিতি আসে, যখন চারপাশের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন পার্থিব কোনো শক্তিই কাজে আসে না। এমন চরম সংকটে মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর রহমত এবং নিজের কোনো গোপন নেক আমল।
রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের এমনই এক বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এই ঘটনা আমাদের শেখায়- নিঃস্বার্থভাবে করা নেক আমল কীভাবে বিপদের সময় আল্লাহর সাহায্য লাভের অসিলা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
গুহায় আটকে পড়া সেই মুহূর্ত
প্রাচীনকালের এক ঘটনা। তিনজন ব্যক্তি একসঙ্গে সফরে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তারা আত্মরক্ষার জন্য পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। কিন্তু আচমকা এক বিশাল পাথর পাহাড় থেকে ধসে পড়ে গুহার মুখটি রুদ্ধ করে দেয়। তারা ঘুটঘুটে অন্ধকারে আটকা পড়েন।
তিনজনের সম্মিলিত শক্তি দিয়েও সেই পাথর এক চুল নড়ানো সম্ভব ছিল না। উপায়ান্তর না দেখে এবং নিশ্চিত মৃত্যুকে সামনে রেখে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন- আজ আমাদের সৎ কাজগুলোর অসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা ছাড়া আর কোনো মুক্তি নেই। তারা ঠিক করলেন, জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ও নিভৃত আমলটির কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবেন।
আরও পড়ুন: যে আমল করলে দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থাকে না
বিজ্ঞাপন
প্রথম বন্ধুর আরজি: বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা
প্রথম ব্যক্তিটি তার এক আমলের কথা তুলে ধরলেন। তিনি ছিলেন একজন পশুপালক। প্রতিদিন রাতে পশুর দুধ দোহন করে তিনি সবার আগে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে পান করাতেন, এরপর সন্তান ও দাস-দাসিদের দিতেন। একদিন ফিরতে দেরি হওয়ায় দেখলেন বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি তাদের না জাগিয়ে দুধের পাত্র হাতে শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওদিকে ক্ষুধার্ত সন্তানরা তার পায়ে লুটিয়ে কাঁদছিল, কিন্তু তিনি বাবা-মায়ের আগে সন্তানদের খাওয়ানো পছন্দ করলেন না। ভোর পর্যন্ত তিনি এভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি ফরিয়াদ করলেন, “হে আল্লাহ! আমি যদি আপনার সন্তুষ্টির জন্যই এটি করে থাকি, তবে আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্তি দিন।” অমনি অলৌকিকভাবে পাথরটি কিছুটা সরে গেল, তবে পুরোপুরি মুক্তি মিলল না।
দ্বিতীয় বন্ধুর আরজি: কুপ্রবৃত্তি থেকে আত্মরক্ষা
দ্বিতীয় ব্যক্তিটি তার জীবনের এক কঠিন পরীক্ষার কথা বললেন। তিনি এক আত্মীয়াকে খুব ভালোবাসতেন। এক সময় মেয়েটি অভাবের তাড়নায় সাহায্য চাইলে তিনি অর্থের বিনিময়ে তার সতীত্ব দাবি করেন। কিন্তু যখন তিনি চূড়ান্ত গুনাহে লিপ্ত হতে যাবেন, তখন মেয়েটি বলে উঠল- ‘আল্লাহকে ভয় করো।’
আরও পড়ুন: প্রত্যেকটি ভালো কাজের প্রতিদান রয়েছে
ব্যক্তিটি বললেন, “হে আল্লাহ! কেবল আপনার ভয়ে আমি সেই মুহূর্তেই তাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং আমার দেওয়া স্বর্ণমুদ্রাও তাকে দান করে দিয়েছিলাম। হে আল্লাহ! যদি আমি এটি আপনার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি, তবে পাথরটি সরিয়ে দিন।” এবার পাথরটি আরও খানিকটা সরে গেল।
তৃতীয় বন্ধুর আরজি: শ্রমিকের পাওনা ও সততা
তৃতীয় ব্যক্তিটি তার সততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন। তিনি ছিলেন একজন নিয়োগকর্তা। এক শ্রমিক তার পারিশ্রমিক না নিয়েই চলে গিয়েছিল। তিনি সেই টাকা খরচ না করে তা দিয়ে পশুপালন শুরু করেন। কয়েক বছরে তা এক বিশাল খামারে পরিণত হয়। একদিন সেই শ্রমিক ফিরে এসে তার পুরনো পাওনা চাইল। তিনি তাকে সব সম্পদ দেখিয়ে বললেন- ‘এসবই তোমার।’ শ্রমিকটি অবাক হলেও তিনি সব কিছু তার হাতে বুঝিয়ে দিলেন।
তিনি দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনার সন্তুষ্টির জন্য যদি আমি এই আমানত রক্ষা করে থাকি, তবে আমাদের মুক্তি দিন।”
আরও পড়ুন: ভালো কাজের পুরস্কার কখন দুনিয়ায়, কখন পরকালে?
তৃতীয় ব্যক্তির দোয়া শেষ হওয়া মাত্রই বিশাল সেই পাথরটি পুরোপুরি সরে গেল। তিন বন্ধু আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আলোর পৃথিবীতে ফিরে এলেন। (সহিহ বুখারি: ২২৭২, সহিহ মুসলিম: ২৭৪৩)
শিক্ষণীয় বার্তা
এই কাহিনী আমাদের শুধু মুগ্ধ করার জন্য নয়, বরং জীবনের দিশা পাওয়ার জন্য। এটি আমাদের শেখায় যে- মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সম্পদ বা ক্ষমতা নয়, বরং তার অন্তরের বিশুদ্ধতা ও গোপন নেক আমল। লোকচক্ষুর আড়ালে করা ছোট্ট একটি নেক আমলও আল্লাহর কাছে এতটাই মূল্যবান হতে পারে, যা জীবনের কঠিনতম সংকটেও মুক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।




