আলেমরা হলেন সমাজের আলোকবর্তিকা। কিন্তু বর্তমানে তাদের একাংশের মধ্যে পারস্পরিক হিংসা ও একে অপরকে খাটো করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যখন পথপ্রদর্শকরাই বিবাদে লিপ্ত হন, তখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং তৈরি হয় এক গভীর দ্বীনি সংকট।
সমাজ কেন বিমুখ হচ্ছে?
আলেমদের এই অভ্যন্তরীণ কলহ দেখে সাধারণ মানুষের মনে দ্বীনের প্রতি ভক্তি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম আলেমদের বিতর্ক দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে, কেবল জেদ আর ঝগড়ার কারণে অন্তরের নূর এবং ইলমের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। এতে সমাজে ফিতনা বাড়ে এবং ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যায়।
নিজেকেই ‘একমাত্র সঠিক’ ভাবার ক্ষতি
অনেক সময় শাখাগত মতপার্থক্য বা ইজতিহাদি ভুলকে কেন্দ্র করে কিছু আলেম বিবাদে লিপ্ত হন। এটি জঘন্য ভুল। নিজেকে একমাত্র ‘হক’ বা সঠিক মনে করে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা এক ধরনের অহংকার এবং ইসলামি শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।’ (সহিহ মুসলিম: ৯১, তিরমিজি: ১৯৯৮, ১৯৯৯, আবু দাউদ: ৪০৯১)
এমনকি নিজের মতটি সঠিক হলেও অন্যকে হেয় করার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি। দ্বীনের কাজ হলো মানুষকে মরণ পর্যন্ত মমতা ও ধৈর্যের সাথে বোঝানো, কাউকে তুচ্ছ করা নয়। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- ‘আপনার রবের পথের দিকে দাওয়াত দিন হিকমত (প্রজ্ঞা) ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল: ১২৫)
আল্লাহ মানুষকে হেদায়েত দিতে চান, কাউকে লজ্জিত বা হেয় করা ইসলামের লক্ষ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: মতপার্থক্য নিরসনে ইসলামের ৮ সোনালি নীতি
কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সফলতার মূল চাবিকাঠি হিসেবে মনকে পবিত্র রাখার কথা বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘অবশ্যই সে সফল হয়েছে, যে নিজের মনকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সুরা শামস: ৯)
হিংসা মানুষের আমলকে ধ্বংস করে দেয়। নবীজি (স.) এক কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন- ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ আগুন যেভাবে কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, হিংসাও মানুষের নেক আমলগুলোকে সেভাবে ধ্বংস করে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩)
তিনি আরও বলেছেন যে, একই মানুষের মনে ঈমান এবং হিংসা একসাথে থাকতে পারে না। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৬০৬)
আরও পড়ুন: আলেমদের জন্য ৬টি বড় সতর্কবার্তা
উত্তরণের সহজ উপায়
হিংসা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় পথ হলো আত্মশুদ্ধি। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) একটি চমৎকার সমাধান দিয়েছেন। তিনি বলেন- যার ওপর হিংসা হয়, তার সামনে এবং পেছনে তার প্রশংসা করুন। তাকে মাঝে মাঝে উপহার দিন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে মন থেকে দোয়া করুন। এতে মনের তিক্ততা দূর হবে এবং ভালোবাসা বাড়বে।
আলেমদের বিভেদ পুরো উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর। তাই হিংসা পরিহার করে ঐক্য ও সহনশীলতার চর্চাই এখন সময়ের দাবি। আত্মশুদ্ধি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমেই আলেমগণ সমাজে প্রকৃত হেদায়েতের আলো ছড়াতে পারেন।




