মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ধ্বংসপ্রাপ্ত সামুদ জাতির পাথুরে নগরী আজও বিস্ময়

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

ধ্বংসপ্রাপ্ত সামুদ জাতির পাথুরে নগরী আজও বিস্ময়

আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের মরুভূমি। যেখানে মাইলের পর মাইল জুড়ে ছড়িয়ে আছে বিশাল সব পাথুরে পাহাড়। সেই পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে একের পর এক সুরম্য অট্টালিকা ও শিল্পমণ্ডিত কুঠুরি। প্রাচীন এই স্থাপত্যশৈলী আজও গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিস্মিত করে। এই নিস্তব্ধ নগরীর নাম ‘মাদাইন সালেহ’, যা হাজার হাজার বছর আগে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ‘সামুদ’ জাতির আবাসস্থল ছিল।

নির্মাণশিল্পের অনন্য কারিগর: সামুদ জাতি

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সামুদ জাতি ছিল ‘কওমে আদ’-এর উত্তরসূরি। তারা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান। সমতলে প্রাসাদ নির্মাণের পাশাপাশি বিশাল সব পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে মজবুত ঘর তৈরির অদ্ভুত দক্ষতা ছিল তাদের। বর্তমান সৌদি আরবের আল-উলা বা মাদাইন সালেহ-এর শিলাখণ্ডগুলোতে আজও তাদের সেই অভাবনীয় কীর্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে জাগতিক সমৃদ্ধি তাদের মধ্যে এনে দিয়েছিল চরম অহংকার ও নৈতিক অবক্ষয়।

সালেহ (আ.)-এর আগমন ও অলৌকিক উষ্ট্রীর মুজিজা

বিপথগামী এই জাতিকে হেদায়েতের জন্য মহান আল্লাহ তাদেরই বংশের হজরত সালেহ (আ.)-কে নবী হিসেবে পাঠান। তিনি তাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেন। নবুয়তের প্রমাণ হিসেবে তারা অলৌকিক কিছু দেখতে চাইলে আল্লাহর কুদরতে একটি বিশাল পাথর থেকে এক বিশালাকৃতি উষ্ট্রী বের হয়ে আসে। সালেহ (আ.) নিয়ম করে দেন- এলাকার কূপ থেকে একদিন এই উষ্ট্রী পানি পান করবে এবং অন্যদিন পুরো জনপদ পানি গ্রহণ করবে। উষ্ট্রীটি যেদিন পানি পান করত, সেদিন বিনিময়ে জনপদের মানুষ প্রচুর দুধ পেত।

আরও পড়ুন: ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক শুভ্রতা: জুলাইখার আসক্তি ও এক অলৌকিক সাক্ষ্য


বিজ্ঞাপন


উষ্ট্রী হত্যা ও নেপথ্যের ষড়যন্ত্র

আল্লাহর এই স্পষ্ট নিদর্শনটি সামুদ জাতির অবাধ্য নেতাদের মনে প্রতিহিংসা জাগিয়ে তোলে। তারা উষ্ট্রীটিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কতিপয় নারীর উস্কানি কাজ করেছিল। যদিও এই নামগুলোর বিস্তারিত বিবরণ সব বর্ণনায় সমানভাবে স্বীকৃত নয়, তবে কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী সামুদ জাতির কতিপয় পাপিষ্ঠ লোক এই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়েছিল। অবশেষে তারা আল্লাহর সেই নিদর্শন উষ্ট্রীটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

আজাবপ্রাপ্ত জাতির চূড়ান্ত পরিণতি

উষ্ট্রী হত্যার পর সালেহ (আ.) তাঁর জাতিকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন নিজেদের ঘরবাড়িতে মাত্র তিন দিন সময় কাটায়, এরপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, শাস্তির পূর্বে তাদের ওপর সতর্কবার্তা ও বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। অবশেষে চতুর্থ দিনে এক ভয়াবহ ‘বিকট চিৎকার’ (সায়হাহ) এবং প্রচণ্ড ভূমিকম্প (রজফাহ) তাদের জনপদকে স্তব্ধ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই শক্তিশালী জাতি তাদের অট্টালিকার ভেতর প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের পাপের কারণে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন।’ (সুরা শামস: ১৪)

আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর হেকমতপূর্ণ বিচার: ইতিহাসের দুই অমর দৃষ্টান্ত

রাসুল (স.)-এর সতর্কতা ও বর্তমান মাদাইন সালেহ

তবুক যুদ্ধের সময় যখন মহানবী (স.) এই এলাকা অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কেউ আজাবপ্রাপ্ত এই জনপদে অহেতুক সময় ব্যয় না করে। তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় দ্রুত এলাকাটি পার হয়েছিলেন।
মাদাইন সালেহ বর্তমানে ইউনেস্কোর একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। পর্যটকরা সেখানে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন দেখতে গেলেও, ইসলামের দৃষ্টিতে এটি এক বড় শিক্ষার জায়গা। বিশাল পাহাড় কেটে যারা নিজেদের নিরাপদ ও অমর করতে চেয়েছিল, আল্লাহর হুকুম অমান্য করায় তারা ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।

মাদাইন সালেহ-এর নিস্তব্ধ পাহাড়গুলো আজও এক নীরব ঘোষণা দিচ্ছে- শক্তি, সমৃদ্ধি বা প্রযুক্তি মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণাম থেকে বাঁচাতে পারে না। যারা আল্লাহর নিদর্শনকে অবজ্ঞা করে, ইতিহাস তাদের জন্য করুণ পরিণতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর