বর্তমান সময় প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগ। আজকের শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন, খেলার মাঠের বদলে তাদের বিচরণ এখন ভার্চুয়াল জগতে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার শিশু-কিশোরদের নৈতিকতা ও মানসিক বিকাশের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্তানদের অনিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এবং তাদের মধ্যে নৈতিক ও ইসলামি মূল্যবোধ জাগ্রত করতে দেশের বিশিষ্ট আলেম ও শিক্ষা-বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
বিজ্ঞাপন
১. আগে নিজেরা দৃষ্টান্ত হোন
সন্তানকে উপদেশ দেওয়ার আগে মা-বাবাকে নিজের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অভিভাবক যদি সারাক্ষণ স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সন্তান আপনাকে দেখে যা শিখবে, তা উপদেশের চেয়েও বেশি কার্যকর।
আরও পড়ুন: যে ৩ দোয়ায় সন্তান হবে নেককার ও আদর্শবান: আল্লাহর শেখানো আমল
২. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি জাগ্রত করুন
সন্তানের অন্তরে এই বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে- ‘মানুষ না দেখলেও আল্লাহ সব দেখছেন।’ এতে তাদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে এবং একাকীত্বেও তারা অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকতে শিখবে।
৩. বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন
কঠোর শাসনের পরিবর্তে সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করুন। যাতে কোনো ভুল অভিজ্ঞতা বা সমস্যায় পড়লে তারা নির্দ্বিধায় আপনার সাথে শেয়ার করতে পারে।
৪. ব্যবহারের সময় ও স্থান নির্ধারণ করুন
স্মার্টফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন। বিশেষ করে খাবার সময়, পড়াশোনা এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত। একাকী ব্যবহারের বদলে পারিবারিক পরিবেশে ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল আসক্তির যুগে ইসলামি জীবন ধরে রাখবেন যেভাবে
৫. প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করুন
স্মার্টফোনের ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ বা নিরাপত্তা সেটিংস চালু রাখুন। এটি সন্তানকে ক্ষতিকর ও অনৈতিক কনটেন্ট থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।
৬. দ্বীনি ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত রাখুন
অলসতা থেকেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত অভ্যাসের জন্ম হয়। তাই সন্তানকে কোরআন তেলাওয়াত, বই পড়া, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত রাখুন।
৭. ইন্টারনেটের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করুন
সাইবার অপরাধ, ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন আসক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো সহজভাবে বুঝিয়ে দিন। এতে তারা নিজেরাই সচেতন হতে শিখবে।
৮. ভালো বন্ধুর সঙ্গ নিশ্চিত করুন
সন্তানের বন্ধুমহল তার চরিত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই সে কার সাথে মিশছে বা অনলাইনে কার সাথে যুক্ত- সে বিষয়ে সজাগ থাকুন।
আরও পড়ুন: ইসলাম 'ভালো বন্ধু' বলেছে যাদের
৯. ধৈর্য ধরুন ও দোয়া করুন
সন্তান লালন-পালনে ধৈর্য অপরিহার্য। রাগ বা কঠোর আচরণ অনেক সময় উল্টো ফল দেয়। ধৈর্যের সাথে বোঝানোর পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়েত কামনা করুন।
সন্তানের জন্য একটি বিশেষ দোয়া
সন্তানদের দ্বীনদার ও চোখের শীতলতা হিসেবে গড়ে তুলতে পবিত্র কোরআনের এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করা যেতে পারে-
উচ্চারণ: রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররতা আ’ইউনিউ ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানান। (সুরা ফুরকান: ৭৪)
১০. বয়সের আগে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন না দেওয়া
অপ্রয়োজনে কম বয়সে (বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের আগে) ব্যক্তিগত স্মার্টফোন না দেওয়াই উত্তম। প্রয়োজনে অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে দেওয়া যেতে পারে।
স্মার্টফোন আজকের বাস্তবতা। এটি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে এটিকে অভিশাপের পরিবর্তে আশীর্বাদে পরিণত করা সম্ভব। সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বরং নৈতিকতার সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোই সময়ের দাবি। অভিভাবকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকাই পারে আগামী প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।

