ইসলামি শরিয়তে চান্দ্র মাসের হিসাব রাখা এবং নতুন চাঁদ দেখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা মুমিনের জন্য কেবল আনন্দের বার্তা নয়, বরং এটি একটি সুন্নতি আমল।
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈদের চাঁদ দেখার গুরুত্ব ও ফজিলত নিচে তুলে ধরা হলো-
১. সময় নির্দেশক হিসেবে চাঁদের ভূমিকা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নতুন চাঁদকে সময় নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন! তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক।’ (সুরা বাকারা: ১৮৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামি বিধান যেমন রোজা, হজ ও ঈদের সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য চাঁদের গতিপ্রকৃতি ও হিসাব রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আরও পড়ুন: বিশ্বজুড়ে ৩ দিন ঈদ: কোথায় আজ, কোথায় শুক্র-শনিবার
২. রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশনা
রমজানের সমাপ্তি ও ঈদের দিন নির্ধারিত হয় চাঁদ দেখার ওপর। রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো (ঈদ করো)। যদি আকাশ তোমাদের কাছে মেঘাচ্ছন্ন হয়, তবে তোমরা ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ মুসলিম: ১০৮১)
নবীজির এই নির্দেশনা পালনের উদ্দেশ্যে পশ্চিম আকাশে চাঁদের অনুসন্ধান করা একটি সওয়াবের কাজ।
বিজ্ঞাপন
৩. চাঁদ দেখা কি সবার জন্য আবশ্যক?
আলেমদের মতে, চাঁদ দেখা এবং চান্দ্র মাসের হিসাব রাখা মুসলমানদের জন্য একটি সামষ্টিক দায়িত্ব বা 'ফরজে কিফায়া'। যদি সমাজের একটি অংশ এই দায়িত্ব পালন করে, তবে সবাই দায়মুক্ত হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের জন্য ঈদের চাঁদ অনুসন্ধান করা 'মুস্তাহাব' বা পছন্দনীয় আমল। বর্তমানের ব্যস্ত সময়েও এই সুন্দর সুন্নাতটি বর্জন করা উচিত নয়।
আরও পড়ুন: আরও পড়ুন: সৌদি আরবে চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ শুক্রবার
৪. চাঁদ দেখার মাসনুন দোয়া
নতুন চাঁদ দেখলে রাসুলুল্লাহ (স.) একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন। তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন, নবীজি (স.) নতুন চাঁদ দেখলে দোয়াটি পাঠ করতেন-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল ইয়ুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম; রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
অর্থ: হে আল্লাহ! এই চাঁদকে ঈমান ও নিরাপত্তা, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫২৬)
৫. ‘পুরস্কারের রাত’ বা লাইলাতুল জায়জা
কিছু হাদিসে ও বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, ঈদের চাঁদ দেখার পর যে রাতটি শুরু হয়, তাকে ‘পুরস্কারের রাত’ বলা হয়। দীর্ঘ এক মাস যারা রোজা রেখেছেন এবং ইবাদত করেছেন, আল্লাহ তাআলা এই রাতে তাদের প্রতিদান দান করেন। এছাড়া বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ঈদের রাতে ইবাদত করবে, তার অন্তর প্রশান্ত থাকবে।
আরও পড়ুন: মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না গেলে বিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া জায়েজ?
৬. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে আলেমদের কাছে পরিগণিত। কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, পাঁচটি রাতে দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না, যার মধ্যে অন্যতম হলো দুই ঈদের রাত। তাই এই সময়ে কেবল আনন্দ-উল্লাসে মত্ত না থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
ঈদের চাঁদ দেখা একটি ইবাদত। চাঁদের সঠিক হিসাব রাখা যেমন শরিয়তের বিধান পালনের জন্য জরুরি, তেমনি এটি সওয়াব হাসিলেরও একটি বড় মাধ্যম। পরিশেষে বলা যায়, ঈদের চাঁদ দেখা সুন্নাহ অনুসরণ ও সওয়াব হাসিলের একটি সুন্দর সুযোগ, যা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণকর।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের চাঁদ দেখার এবং এর বরকত হাসিল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

