ইসলামি শরিয়তে বছরের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও পুণ্যময় রাতের নাম ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। একজন মুমিনের জন্য শবে কদরের ফজিলত লাভ করা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তবে নারীদের বিশেষ শারীরিক অবস্থার (মাসিক বা পিরিয়ড) কারণে অনেক সময় তারা মুষড়ে পড়েন যে, হয়তো তারা এই রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিন্তু শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ঋতুবতী নারীরাও বিশেষ কিছু আমলের মাধ্যমে শবে কদরের পূর্ণ সওয়াব হাসিল করতে পারেন।
শবে কদরের গুরুত্ব ও রাসুল (স.)-এর সুন্নাহ
শবে কদরের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্বের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি: ১৯০১, মুসলিম: ৭৬০)
রমজানের শেষ দশকে রাসুল (স.) ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রমজানের শেষ দশক শুরু হলে নবী (স.) কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জেগে থাকতেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন।’ (বুখারি: ২০২৪, মুসলিম: ১১৭৪)
আরও পড়ুন: শবে কদরে অন্তত ৪ আমল ছেড়ে দেবেন না
পিরিয়ড অবস্থায় শবে কদরের ফজিলত
শবে কদরের ফজিলত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান। কোনো নারীর মাসিক শুরু হলে তিনি এই রাতের ফজিলত থেকে বঞ্চিত হন না। যদিও শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এই অবস্থায় নামাজ আদায়, মুসহাফ স্পর্শ করে কোরআন তেলাওয়াত করা এবং কাবা শরিফ তাওয়াফ করা নিষেধ, তবে এর বাইরেও জিকির, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রজনী ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা সম্ভব।
ঋতুবতী নারীদের জন্য শবে কদরের বিশেষ আমলসমূহ
১. জিকির-আজকার করা: শারীরিক পবিত্রতা অর্জন না করা পর্যন্ত নামাজ পড়া সম্ভব না হলেও জিকির করা বা আল্লাহর নাম জপতে কোনো বাধা নেই। এ রাতে বেশি বেশি এই তাসবিহগুলো পাঠ করা যেতে পারে- সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।
২. বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ: ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা গুনাহ মাফের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পিরিয়ড চলাকালীন নারীরা অন্তরের আকুতি দিয়ে আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে পারেন। পড়ুন- ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি)।
৩. শবে কদরের বিশেষ দোয়া পাঠ: রাসুল (স.) শবে কদরে পড়ার জন্য যে দোয়াটি শিখিয়েছেন, তা পাঠ করতে ওজু বা বিশেষ শারীরিক পবিত্রতার শর্ত নেই। দোয়া: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ (হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল। ক্ষমা করাটা আপনার পছন্দ। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন)। (তিরমিজি: ৩৫১৩)
আরও পড়ুন: শবে কদর অনুসন্ধান: আমল, দোয়া ও আলামত
৪. দোয়া ও মুনাজাত করা: দোয়া করা নিজেই একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘দোয়া-ই ইবাদত।’ (তিরমিজি: ২৮৯৫) নারীরা এই রাতে হাত তুলে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করে দীর্ঘ সময় মুনাজাত করতে পারেন।
৫. দরুদ পাঠ ও দ্বীনি আলোচনা শোনা: রাসুল (স.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং দ্বীনি আলোচনার বই পড়া বা ইন্টারনেটে নির্ভরযোগ্য আলেমদের আলোচনা ও কোরআনের তাফসির শোনার মাধ্যমেও সময়টি ইবাদতে কাটানো যায়।
ইবাদত কেবল শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের প্রকাশ। কোনো নারী যদি মাসিকের সময় আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্মান জানিয়ে নামাজ-রোজা থেকে বিরত থাকেন এবং জিকির-দোয়ার মাধ্যমে শবে কদর অতিবাহিত করেন, তবে তিনিও ইনশাআল্লাহ শবে কদরের পূর্ণ সওয়াব পাবেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের বরকত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

