শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ইতেকাফে দুনিয়াবি আলাপ: শরিয়তের বিধান ও শিষ্টাচার

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

ইতেকাফে দুনিয়াবি আলাপ: শরিয়তের বিধান ও শিষ্টাচার

পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের ইতেকাফ ইসলামের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমদের মতে, এটি ‘সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া’- অর্থাৎ কোনো জনপদের কিছু মানুষ এটি আদায় করলে পুরো এলাকাবাসী দায়মুক্ত হয়, অন্যথায় পুরো এলাকার মানুষ সুন্নত পরিত্যাগের গুনাহে দায়ী হতে পারে। ইতেকাফের সময় মুতাকিফ (যিনি ইতেকাফ করেন) পার্থিব সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর ঘরে অবস্থান করেন। এই সময় দুনিয়াবি আলাপচারিতার সীমা কতটুকু, সে বিষয়ে ইসলামি শরিয়ত ও ফিকহি গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

ইতেকাফের মূল লক্ষ্য

ইতেকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টির সঙ্গ ত্যাগ করে স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিমগ্ন হওয়া। ফকিহগণ একে সংজ্ঞায়িত করেছেন- ‘ইনকিতা আনিল খালক ও ইত্তিসাল বিল হক’ (সৃষ্টিজগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরম সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা) হিসেবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘তোমরা যখন মসজিদে ইতেকাফ অবস্থায় থাকো, তখন স্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৭)
এই নির্দেশনার নিহিতার্থ হলো, ইতেকাফ এমন এক বিশেষ ইবাদত যেখানে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত করবে।

কথাবার্তাকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

১. প্রয়োজনীয় কথা (জায়েজ): ইতেকাফকারী তার একান্ত ব্যক্তিগত বা জরুরি প্রয়োজনে কথা বলতে পারেন। যেমন পরিবারের খবরাখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চেয়ে পাঠানো বা দ্বীনি মাসয়ালা আলোচনা করা। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী কারিম (স.) ইতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে তাঁর মাথা আমার ঘরের দিকে এগিয়ে দিতেন, আর আমি তাঁর চুল আঁচড়ে দিতাম। তিনি ঘরে প্রবেশ করতেন না প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া। (সহিহ বুখারি: ২০২৮; সহিহ মুসলিম: ২৯৭)
এটি প্রমাণ করে যে, অতি প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিক কথাবার্তা ইতেকাফের পরিপন্থী নয়।

আরও পড়ুন: ইতেকাফকারী যেসব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন


বিজ্ঞাপন


২. অনর্থক দুনিয়াবি আলাপ (মাকরুহ): অপ্রয়োজনীয় গল্পগুজব, আড্ডা, ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনৈতিক আলোচনা করা ইতেকাফ অবস্থায় মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। কারণ এসব বিষয় ইতেকাফের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে ব্যাহত করে। ইমাম কাসানি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইতেকাফকারীর জন্য উত্তম হলো সে যেন অধিকাংশ সময় জিকির, তেলাওয়াত ও ইবাদতে ব্যয় করে এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে।’ (বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৭৪)

৩. গুনাহের কথা (হারাম): গিবত বা পরনিন্দা, মিথ্যা বলা, ঝগড়া ও অশ্লীল আলাপ সাধারণ সময়েও কবিরা গুনাহ; ইতেকাফ অবস্থায় তা আরও মারাত্মক। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো নিরর্থক বিষয় ত্যাগ করা।’ (জামে তিরমিজি: ২৩১৭)

একেবারে চুপ থাকা কি ইবাদত?

অনেকে মনে করেন, ইতেকাফে একদম কথা না বলে ‘বোবা’ সেজে থাকা বেশি সওয়াবের। এটি একটি ভুল ধারণা। হানাফি মাজহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ আছে- ইবাদত মনে করে সম্পূর্ণ নীরব থাকা যেমন মাকরুহ, তেমনি অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়াও মাকরুহ। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলা এবং বাকি সময় জিকির-ইবাদতে কাটানোই হলো সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। (রদ্দুল মুহতার: ২/৪৪৯)

আরও পড়ুন: নারীদের ইতেকাফের নিয়ম কানুন

স্মার্টফোনের ব্যবহার ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

বর্তমান যুগে ইতেকাফকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্মার্টফোন। মসজিদে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, দীর্ঘ ফোনালাপ বা ভিডিও দেখে সময় কাটানো ইতেকাফের রুহ বা প্রাণশক্তিকে নষ্ট করে দেয়। ইতেকাফের লক্ষ্য হলো দুনিয়া থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন হওয়া, অথচ স্মার্টফোন মুতাকিফকে মসজিদের ভেতর বসেই সারা দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখে। তাই একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার বর্জন করা উচিত।

মুতাকিফদের জন্য কিছু পরামর্শ

  • অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ও কুশল বিনিময় এড়িয়ে চলা।
  • মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করে অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলা।
  • সময়কে কোরআন তেলাওয়াত, তওবা-ইস্তেগফার ও নফল নামাজে ভাগ করে নেওয়া।
  • কেউ আলোচনার প্রস্তাব দিলে বিনয়ের সঙ্গে তাকে ইবাদতে মনোনিবেশ করার অনুরোধ জানানো।

ইতেকাফ মূলত আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা জায়েজ হলেও মুতাকিফের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো অল্প কথা ও অধিক জিকিরে নিমগ্ন থাকা। দুনিয়াবি আড্ডা ইতেকাফকে বাতিল না করলেও এর আধ্যাত্মিক প্রভাব ও সওয়াবকে ক্ষীণ করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুতাকিফের উচিত নিজের জিহ্বা ও সময়কে নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিটি মুহূর্ত মহান আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে ব্যয় করা।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর