মানবজীবনে শত্রুতা বা ঈর্ষার মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ নবী-রাসুলগণও পদে পদে শত্রুর কঠিন ষড়যন্ত্র ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁরা কখনো বিচলিত হননি; বরং মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে বিশেষ কিছু দোয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা কামনা করেছেন।
ইসলামি স্কলার ও ফিকহবিদদের মতে, দৃঢ় বিশ্বাস ও মনোযোগের সঙ্গে নিচের আমলগুলো করলে আল্লাহ তাআলা শত্রুর অনিষ্ট থেকে বান্দাকে হেফাজত করেন এবং ষড়যন্ত্রকারীর চাল অনেক সময় তার নিজের দিকেই ফিরিয়ে দেন।
বিজ্ঞাপন
শত্রুর অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে হাদিসে বর্ণিত কার্যকর কিছু আমল নিচে তুলে ধরা হলো-
১. বিপদের সময় নবীজির প্রিয় দোয়া
যখন কোনো শত্রু বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এই দোয়াটি পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফী নুহূরিহিম, ওয়া নাঊযু বিকা মিন শুরূরিহিম।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের মোকাবিলায় পেশ করছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৭)
আরও পড়ুন: প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ৪০ দোয়া
২. যখন শত্রু সংখ্যায় শক্তিশালী
কঠিন বা সংকটময় মুহূর্তে সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্ববর্তী নবীগণ আল্লাহর এই মহান বাণীর ওপর আস্থা রাখতেন-
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।
অর্থ: ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সহিহ বুখারি: ৪৫৬৩)
উল্লেখ্য যে, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি এই দোয়াটি পাঠ করেছিলেন।
৩. ঈর্ষা ও জাদুটোনা থেকে সুরক্ষা
শত্রুতা অনেক সময় কুদৃষ্টি, ঈর্ষা (হাসাদ) কিংবা জাদুটোনার মাধ্যমেও হতে পারে। এসব অনিষ্ট থেকে বাঁচতে রাসুলুল্লাহ (স.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ফালাক ও নাস পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই দুটি সুরাকে ‘মুআউযাতাইন’ বা আশ্রয় প্রার্থনার দুই সুরা বলা হয়।
প্রতিদিন তিনবার করে এই সুরাগুলো পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে কুদৃষ্টি, হিংসা ও গোপন অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন।
আরও পড়ুন: যে দোয়ায় আল্লাহর সাহায্য আসে
৪. জালেমের হাত থেকে রক্ষার প্রার্থনা
ফেরাউন ও তার বাহিনীর ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের মুখে হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন, তা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। কোনো জালেম বা শক্তিশালী শত্রুর ভয়ে থাকলে এই দোয়াটি পাঠ করা যেতে পারে-
رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: রব্বি নাজ্জিনী মিনাল কওমিয যোয়ালিমীন।
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা কাসাস: ২১)
৫. ঘরের বাইরে বের হওয়ার দোয়া
যেকোনো অনিষ্ট সাধারণত ঘরের বাইরেই বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাসা থেকে বের হওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো এই দোয়াটি পড়লে আল্লাহর হেফাজত লাভ হয়-
بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে বের হচ্ছি, আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচা ও নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৫)
আরও পড়ুন: যে দোয়া কোরআনের সুরার মতো শেখাতেন নবীজি
৬. প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশেষ দোয়া
শত্রুবাহিনীকে পরাজিত করতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে রাসুলুল্লাহ (স.) খন্দকের যুদ্ধে এই দোয়াটি করেছিলেন-
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ، سَرِيعَ الْحِسَابِ، اهْزِمِ الْأَحْزَابَ، اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা মুনযিলাল কিতাব, সারী‘আল হিসাব, আহজিমিল আহযাব। আল্লাহুম্মাহজিমহুম ওয়া যালজিলহুম।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! কিতাব নাজিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আপনি শত্রুবাহিনীকে পরাজিত করুন। হে আল্লাহ! তাদের পরাজিত করুন এবং তাদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি করে দিন।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
দোয়ার পাশাপাশি করণীয়
আলেমদের মতে, দোয়ার পাশাপাশি নিজের আচরণ ও লেনদেনে সংযত থাকা অত্যন্ত জরুরি। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো বিনা কারণে কারো সঙ্গে শত্রুতা না করা এবং কারো অধিকার নষ্ট না করা।
যদি কোনো ব্যক্তি নিজে জুলুম না করে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখে, তবে মহান আল্লাহর গায়েবি সাহায্য তার সঙ্গে থাকে।
ষড়যন্ত্রকারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর পরিকল্পনার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। তাই শত্রুর ভয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সুন্নাহসম্মত দোয়া ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।

