সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

শিয়া ও আহলে সুন্নাহ: আকিদাগত পার্থক্য ও সমসাময়িক বাস্তবতা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

শিয়া ও আহলে সুন্নাত: আকিদাগত পার্থক্য ও সমসাময়িক বাস্তবতা

ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে শিয়া ও সুন্নি ধারার মধ্যকার মতভেদ একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। এই মতপার্থক্যের উৎস মূলত রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব বা ‘ইমামত’ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। সময়ের বিবর্তনে এই পার্থক্যের পরিধি আকিদা, ফিকহ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিশ্লেষণে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে এই ঐতিহাসিক বিতর্কটি নতুন আঙ্গিকে আলোচনায় আসছে।

মৌলিক আকিদাগত ভিন্নতা (উসুল বনাম ফুরু)

ইসলামি গবেষকদের মতে, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যকার পার্থক্য কেবল শাখা-প্রশাখার কোনো বিষয়ে নয়, বরং এটি দ্বীনের মৌলিক কিছু মূলনীতির (উসুল) ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীজির ইন্তেকালের পর খেলাফতের ভিত্তি ছিল সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শুরা’। অপরদিকে, শিয়া মতবাদের প্রধান শাখাগুলোর মতে, ‘ইমামত’ বা নেতৃত্ব কোনো নির্বাচনযোগ্য বিষয় নয়; বরং এটি দ্বীনের একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ এবং নবুয়তের মতোই একটি ঐশ্বরিক বিষয়।

সাহাবায়ে কেরাম: সুন্নাহ ও উম্মাহর সেতুবন্ধন

আকিদাগত এই দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো সাহাবায়ে কেরামের মূল্যায়ন। আহলুস সুন্নাহর মৌলিক নীতি হলো- সাহাবায়ে কেরাম হলেন মহানবী (স.)-এর সুন্নাহ ও উম্মাহর মধ্যকার একমাত্র সেতুবন্ধন। তাঁদের মাধ্যমেই কোরআন ও সুন্নাহ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। ফলে তাঁদের নির্ভরযোগ্যতা (আদালত) অস্বীকার করা মানেই প্রকারান্তরে দ্বীনের মূল ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন (সুরা তওবা: ১০০)। কিন্তু শিয়াদের একটি বড় অংশ সাহাবায়ে কেরামের এই সামগ্রিক মর্যাদা ও বিশ্বস্ততাকে সুন্নিদের মতো স্বীকার করে না, যা সুন্নি আলেমদের নিকট আকিদাগত বড় বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য।

আরও পড়ুন: আকিদার বিদআত: স্থান, বস্তু ও ব্যক্তির 'অতিশ্রদ্ধা' থেকে সতর্ক হোন


বিজ্ঞাপন


আকিদায় দৃঢ়তা ও সামাজিক সুস্থিতি

উভয় পক্ষই নিজ নিজ মূলনীতিকে সত্যের মাপকাঠি মনে করে এবং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আকিদাগত দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে নিজ বিশ্বাসে অটল থাকার অর্থ এই নয় যে, তা সামাজিকভাবে উগ্রবাদ বা ঘৃণার জন্ম দেবে। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ইনসাফ ও শৃঙ্খলা। আকিদাগত ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে উম্মাহর অভ্যন্তরে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা কেবল বহিঃশত্রুকেই লাভবান করে। তাই আদর্শিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

হাদিস ও শরিয়তের উৎসে ভিন্নতা

নেতৃত্ব ও সাহাবা-সংক্রান্ত এই মৌলিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে দুই ধারার মধ্যে হাদিস গ্রহণের সূত্র এবং শরিয়তের প্রয়োগে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। শিয়ারা কেবল তাঁদের নির্ধারিত ইমামদের মাধ্যমেই হাদিস গ্রহণ করে থাকে। যেহেতু তারা সুন্নিদের স্বীকৃত অধিকাংশ হাদিস বিশারদ ও সাহাবিকে বর্ণনাকারী হিসেবে গ্রহণ করে না, তাই উভয় ধারার আকিদা ও আমলের বিধি-বিধানে এক দুস্তর দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে আমাদের আকিদা কী হবে?

সমসাময়িক রাজনৈতিক মেরুকরণ

একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই ধর্মীয় বিভাজনের সমান্তরালে একটি ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান আজ অনেক ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। দেখা যাচ্ছে, আকিদাগত বিশাল ফারাক থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যবস্থার অসম বলয়ে কোনো কোনো শিয়াপ্রধান শক্তি আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও আপসহীন অবস্থান নিচ্ছে। পক্ষান্তরে, সুন্নিপ্রধান বহু রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজনে ভিন্নতর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। এই বাস্তব পর্যবেক্ষণটি অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানদের মনে নতুন ভাবনার উদ্রেক করেছে।

শিয়া-সুন্নি মতভেদ কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, বরং এটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও দালিলিক পার্থক্যের বিষয়। জটিল আকিদাগত ও ঐতিহাসিক বিতর্কগুলো আলেমদের পরিমণ্ডলে থাকাই শ্রেয়। মতভেদ থাকতেই পারে; তবে তা যেন পারস্পরিক অবিচার বা অনর্থক সংঘাতের কারণ না হয়। বর্তমান বিশ্বের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং একটি ইনসাফপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য উপলব্ধি ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর