পবিত্র রমজান মাস চলছে। এ মাসেই সামর্থ্যবান মুসলমানরা তাদের সারা বছরের উপার্জিত অর্থের ওপর জাকাত আদায়ের প্রস্তুতি নেন। তবে জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ‘নিসাব’ থাকা আবশ্যক। বর্তমান সময়ে সোনা ও রুপার দামের ব্যাপক পার্থক্যের কারণে একটি প্রশ্ন বারবার দেখা দেয়- নগদ টাকার জাকাত কোন মানদণ্ডে বা ভিত্তিতে হিসাব করতে হবে?
নবীজি (স.)-এর নির্ধারিত মানদণ্ড
রাসুলুল্লাহ (স.) জাকাতের জন্য দুটি পৃথক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। রুপার ক্ষেত্রে ২০০ দিরহাম এবং স্বর্ণের ক্ষেত্রে ২০ দিনার। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘পাঁচ উকিয়ার (২০০ দিরহাম) কম রুপার ওপর জাকাত নেই।’ (সহিহ বুখারি : ১৪০৫)
ফিকহি পরিমাপ অনুযায়ী, রুপার এই নিসাব হলো সাড়ে ৫২ ভরি (তোলা) এবং স্বর্ণের নিসাব সাড়ে সাত ভরি (তোলা)।
আরও পড়ুন: রুপার নিসাবের মূল্য পরিমাণ স্বর্ণ থাকলে জাকাত দিতে হবে?
কাগুজে মুদ্রা বা নগদ টাকার নেসাব কোনটি?
ইসলামের প্রাথমিক যুগে দিনার ও দিরহামের বাজারমূল্য প্রায় কাছাকাছি ছিল। কিন্তু বর্তমানে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী হলেও রুপার দাম সে তুলনায় অনেক কম। এ কারণে নগদ টাকার নিসাব নির্ধারণে সমকালীন ফকিহগণ বিভিন্ন মত প্রদান করেছেন। তবে সমকালীন অধিকাংশ ফকিহ ও ফতোয়া বোর্ডের মতে, নগদ টাকার ক্ষেত্রে রুপার নিসাবকেই (সাড়ে ৫২ ভরি) মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা অধিক সতর্কতামূলক ও শ্রেয়।
রুপার নিসাবকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ
১. দরিদ্রের স্বার্থরক্ষা: ফিকহ শাস্ত্রের একটি সাধারণ মূলনীতি হলো- যেখানে একাধিক মানদণ্ডের সম্ভাবনা থাকে, সেখানে দরিদ্রদের জন্য যেটি বেশি উপকারী সেটিই গ্রহণ করা হবে। রুপার নিসাব ধরলে জাকাতদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের অধিক পরিমাণ অভাবী মানুষ জাকাতের সুফল ভোগ করতে পারে।
২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কিছু আলেমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নববি যুগে স্বর্ণ ও রুপার মূল্যমান কাছাকাছি ছিল এবং রুপার নিসাবটিই সমাজে সর্বাধিক প্রয়োগ হতো। ফলে নগদ টাকার ক্ষেত্রেও এই নিসাবটিকেই নিরাপদ মনে করা হয়।
৩. সংশয়মুক্ত ইবাদত: স্বর্ণের নেসাব (সাড়ে সাত ভরি) অনুযায়ী নগদ টাকার জাকাত দিতে হলে কয়েক লক্ষ টাকার মালিক হতে হয়। এতে অনেক সচ্ছল ব্যক্তি জাকাতের আওতার বাইরে থেকে যেতে পারেন। তাই অনেক আলেম মনে করেন, রুপার নিসাব অনুযায়ী জাকাত দিলে ইবাদত নিশ্চিতভাবে আদায় হয়।
আরও পড়ুন: পাওনা টাকার জাকাত দিতে হবে কি?
মিশ্র সম্পদের হিসাব
যদি কারো কাছে কিছু স্বর্ণ, কিছু রুপা এবং কিছু নগদ টাকা থাকে, তবে সব মিলিয়ে যদি তার মোট বাজারমূল্য সাড়ে ৫২ ভরি রুপার বর্তমান দরের সমান হয়, তবে ওই ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হবে। ‘মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ’-তে বর্ণিত হয়েছে, প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম মাকহুল (রাহ.) বলেছেন, ‘তোমার কাছে থাকা সোনা ও রুপা সব একত্র করো। যদি তা ২০০ দিরহামের (রুপার নিসাব) সমান হয়, তবে জাকাত আদায় করো।’ (বর্ণনা নম্বর ৯৯৭৯)
সারকথা, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, যার কাছে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্য আছে এবং তা এক বছর মালিকানায় অতিবাহিত হয়েছে, তাকে সম্পদের ২.৫ শতাংশ (৪০ ভাগের ১ ভাগ) জাকাত দিতে হবে। দরিদ্রের কল্যাণ ও সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের কথা বিবেচনায় রেখে অনেক ফকিহ এই নিম্নতম মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, সুনানে আবু দাউদ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, বাদায়েউস সানায়ে ও নাওয়াদিরুল ফিকহ।

