রমজান সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে একজন মুমিন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও নানাবিধ ভোগবিলাস থেকে বিরত থাকেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)
রোজার এই কঠিন সাধনার বিনিময়ে আল্লাহর বান্দাদের জন্য দুই মহাআনন্দের ঘোষণা রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন- ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হলো তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ (সহিহ বুখারি: ৭৪৯২)
বিজ্ঞাপন
প্রথম আনন্দ: ইফতারের তৃপ্তি
সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার পর সূর্যাস্তের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ইফতার শুধু খাদ্য গ্রহণের মুহূর্ত নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক তৃপ্তির সময়। বান্দা অনুভব করে- সে আল্লাহর একটি হুকুম পূর্ণ করেছে। ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না; তাদের একজন হলো রোজাদার, যখন সে ইফতার করে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৫২৬)
অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন, ইফতারের সময় বান্দা যখন আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধরে বসে থাকে, তখন তার এই আনুগত্য আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়। এই আত্মিক প্রশান্তিই রোজাদারের প্রথম মহাআনন্দ।
আরও পড়ুন: ইফতারের বরকতময় মুহূর্ত: কিছু মাসনুন আমল
দ্বিতীয় আনন্দ: রবের দিদার
রোজাদারের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার আখেরাতে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘রোজা আমারই জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৪)
কেয়ামতের ভয়াবহ দিনে, যখন মানুষ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত থাকবে, তখন রোজাদাররা আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের সৌভাগ্যে ধন্য হবে। মহান রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সেই আনন্দই হবে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
রাইয়ান: রোজাদারদের বিশেষ তোরণ
রোজাদারদের সম্মানার্থে জান্নাতে রয়েছে একটি বিশেষ দরজা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে; তারা ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৬) এই বিশেষ তোরণ রোজার মর্যাদা ও মাহাত্ম্যেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
কেয়ামতের দিন রোজার সুপারিশ
রোজাদারের জন্য আরেকটি বড় সুসংবাদ হলো কেয়ামতের কঠিন ময়দানে এই রোজাই তার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘কেয়ামতের দিন রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত রেখেছি, তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে প্রতিপালক, আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, এরপর তাদের উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ: ৬৬২৬; মেশকাত: ১৯৬৩)
আরও পড়ুন: কেয়ামতের দিন যে সুপারিশ করবে রোজা ও কোরআন
রোজার আরও কিছু ফজিলত
হাদিসে এসেছে, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সবরের মধ্য দিয়ে যে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়, তা আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদাপূর্ণ। রোজাদার যখন নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে রোজা পালন করে, তখন ফেরেশতারাও তার জন্য রহমতের দোয়া করেন।
রোজাদারের দুই আনন্দ তার ধৈর্য, নিষ্ঠা ও তাকওয়ারই প্রতিফলন। ইফতারের ক্ষণিক প্রশান্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই চিরস্থায়ী আনন্দের কথা, যা অপেক্ষা করছে আখেরাতে। পাশাপাশি রাইয়ান দরজা দিয়ে প্রবেশ এবং রোজার সুপারিশ লাভ মুমিনের জন্য এক পরম সৌভাগ্য।
আসুন, রমজানের প্রতিটি রোজা যথাযথ মর্যাদা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করি, যেন আমরা উভয় জগতের এই অনন্য আনন্দ ও সম্মান লাভ করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে রোজা পালনের এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও দিদার লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।




