নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। এতে জয়-পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় এই সাময়িক ফলাফলকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়, সৃষ্টি হয় বিদ্বেষ ও সহিংসতা। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষের জন্যই সুস্পষ্ট নৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ক্ষমতা, পদ-পদবি বা জনপ্রিয়তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও আমানত।
বিজয়ের পর: কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও সংযম
বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘সাহায্য তো শুধু পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকেই হয়।’ (সুরা আলে ইমরান: ১২৬) আরও বলেন- ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে… তখন আপনি আপনার পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ (সুরা নাসর: ১–৩)
অতএব, বিজয়ী হওয়ার পর প্রথম কর্তব্য হলো শুকরিয়া আদায় করা, অহংকার নয়।
অহংকার বর্জন ও বিনয়
আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা নাহল: ২৩) মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (স.) বিজয়ীর বেশে নয়; বরং বিনয়ের প্রতীক হয়ে শহরে প্রবেশ করেন। তাঁর মাথা ছিল আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় অবনত (সিরাতে ইবনে হিশাম)। এটি বিজয়ের সর্বোচ্চ আদর্শ।
আরও পড়ুন: একটি ভোটের কারণে আত্মীয়তা নষ্ট করবেন না: কোরআন-হাদিসের সতর্কবার্তা
উপহাস ও বিদ্রূপ থেকে বিরত থাকা
পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ- ‘হে মুমিনগণ, কোনো জাতি যেন অন্য জাতিকে উপহাস না করে; কেননা তারা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে।’ (সুরা হুজরাত: ১১)
পরাজিত পক্ষকে ব্যঙ্গ, অপমান বা উসকানিমূলক আচরণ করা ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী।
পরাজয়ের পর: ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আত্মসমালোচনা
নির্বাচনে পরাজয় মানেই সবকিছু শেষ নয়; এটি আল্লাহর ফয়সালা (কদর) হিসেবে মেনে নেওয়া ইসলামি শিষ্টাচারের অংশ। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না; যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৯) আরও বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘মুমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক; তার সব বিষয়ই কল্যাণকর… সুখে শুকরিয়া, দুঃখে ধৈর্য; উভয়ই তার জন্য কল্যাণ।’ (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)
অতএব, পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ভাঙচুর, অরাজকতা বা সহিংসতা সৃষ্টি করা ‘ফাসাদ’-এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন: সালাফরা নেতা নির্বাচনে যে ১১ গুণকে গুরুত্ব দিতেন
উভয় পক্ষের জন্য: ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ব
রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনো ঈমানি ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ বলেন- ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই।’ (সুরা হুজরাত: ১০) আরও বলেন- ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে; ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা মায়িদা: ৮)
রাসুলুল্লাহ (স.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেন- ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম (পবিত্র)।’ (সহিহ বুখারি: ৬৭)
অতএব, বিজয়ী পক্ষের প্রতিহিংসা কিংবা পরাজিত পক্ষের সহিংস প্রতিক্রিয়া—উভয়ই শরিয়তবিরোধী।
নেতৃত্ব একটি আমানত ও জবাবদিহিতা
যিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তিনি কেবল নিজের দলের নন; বরং সমগ্র জনগণের প্রতিনিধি। নেতৃত্ব একটি ‘আমানত’। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)
ক্ষমতার অপব্যবহার বা আমানতের খেয়ানত করলে পরকালে কঠিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
আরও পড়ুন: কেমন ন্যায়বিচারের কথা বলে ইসলাম
অতিরিক্ত উল্লাস ও সহিংসতা পরিহার
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ১০)
বিজয়ের আনন্দে অশালীন স্লোগান, সম্পদ নষ্ট, প্রতিপক্ষকে হুমকি- এসব ইসলামসম্মত নয়। সামাজিক শান্তি রক্ষা করা ঈমানের দাবি।
নির্বাচন আসবে-যাবে; জয়-পরাজয় পরিবর্তিত হবে। কিন্তু একজন মুমিনের নৈতিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকা উচিত। বিজয়ে কৃতজ্ঞতা ও বিনয়, পরাজয়ে ধৈর্য ও আত্মসমালোচনা, উভয় অবস্থায় ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ব- এগুলোই ইসলামের শিক্ষা। জয় বা পরাজয় সব অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

