রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ফেসবুকে প্রাক্তনের ছবি দেওয়া কতটা নৈতিক? ইসলামি দৃষ্টিতে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ফেসবুকে প্রাক্তনের ছবি দেওয়া কতটা নৈতিক? ইসলামি দৃষ্টিতে

পারিবারিক বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্স হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। উভয়েই হয়তো নিজেদের মতো করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা গেল, প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রী তাদের পুরনো কিছু একান্ত ছবি বা ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। ক্যাপশনে হয়তো বিষাদমাখা কিছু কথা অথবা প্রচ্ছন্ন কোনো খোঁচা। উদ্দেশ্য যা-ই হোক—ভালোবাসা কিংবা প্রতিশোধস্পৃহা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের ছবি প্রকাশের এই প্রবণতা বর্তমানে একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। ইসলামি শরিয়ত ও সামাজিক শিষ্টাচারের আলোকে এর বিধান কী?

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: আবেগ বনাম বাস্তবতা

তালাক বা বিচ্ছেদের পর শরিয়তের দৃষ্টিতে তারা একে অপরের জন্য ‘গাইরে মাহরাম’ বা ভিন নারী-পুরুষের হুকুমে চলে যান। সমসাময়িক ইসলামি স্কলারদের একটি বড় অংশের মতে, বিচ্ছেদের পর প্রাক্তনের ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করা একাধিক কারণে শরিয়তসম্মত নয়।

১. পর্দার বিধান ও গাইরে মাহরাম

ইসলামি শরিয়তের মৌলিক বিধান হলো, নারী-পুরুষ উভয়েই তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং পর্দার বিধান মেনে চলবে। আল্লাহ তাআলা সুরা নূরে মুমিনদের দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে, বিচ্ছেদের পর প্রাক্তনের ছবি ফেসবুকে আপলোড করা মানেই তাকে পরপুরুষের সামনে প্রদর্শন করা এবং নিজেও গাইরে মাহরামের দিকে দৃষ্টিপাত করা। যদিও ছবিগুলো বিবাহিত অবস্থায় তোলা হতে পারে, কিন্তু বর্তমান সময়ে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় তা জনসম্মুখে আনা পর্দার বিধানের পরিপন্থী।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: বিধবা নতুন বিয়ে করলে আগের স্বামীর মিরাস পাবে?

২. আমানতের খেয়ানত ও গোপনীয়তা

দাম্পত্য জীবন পারস্পরিক বিশ্বাস ও আমানতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যে তার সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হবার পর তার গোপন বিষয় মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম: ১৪৩৭)

মুহাদ্দিসিনে কেরাম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, শুধু শারীরিক সম্পর্কের গোপনীয়তা নয়, বরং দাম্পত্য জীবনের যেকোনো একান্ত বিষয় যা প্রকাশ করলে অপর পক্ষ লজ্জিত হয়, তা প্রচার করা আমানতের খেয়ানত।

৩. কাউকে কষ্ট দেওয়া

অনেকে ‘ভালোবাসা’ বা ‘স্মৃতি’র দোহাই দিয়ে ছবি আপলোড করেন। কিন্তু ইসলামি নীতি হলো—‘সৎ উদ্দেশ্য অসৎ কাজকে বৈধ করে না’। আপনার শেয়ার করা ছবির কারণে যদি প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রীর বর্তমান সংসার জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয় কিংবা তিনি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন, তবে তা ইসলামে নিষিদ্ধ ‘ইজা’ বা কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।

কোরআনে বলা হয়েছে- ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা নিশ্চয়ই বড় অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব: ৫৮)

আরও পড়ুন: দুইবার বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর কাছে থাকবে?

৪. ফিতনা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা

ইসলামে এমন সব পথ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ফিতনা বা বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। প্রাক্তনের ছবি প্রকাশ করলে তার নতুন জীবনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্যের অবকাশ থাকতে পারে যে, ছবিটি যদি শালীন হয় তবে হুকুম কী হবে? তবে ফিতনা এবং সামাজিক ক্ষতির আশঙ্কায় জমহুর আলেমগণ (সংখ্যাগরিষ্ঠ স্কলার) একে বর্জনীয় বলেছেন।
আইনি বাস্তবতা

ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এটি দেশের প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয় হতে পারে। প্রচলিত সাইবার আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের আলোকে, কারো অনুমতি ছাড়া, সে বর্তমান হোক বা প্রাক্তন, তার ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তার (Right to Privacy) লঙ্ঘন।

মুমিনের করণীয়

বিচ্ছেদ মানেই সম্পর্কের তিক্ত সমাপ্তি নয়। আল্লাহ তাআলা বিচ্ছেদের পরও সৌজন্যবোধ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরের অনুগ্রহ ভুলে যেও না।’ (সুরা বাকারা: ২৩৭)

প্রকৃত মুমিনের পরিচয় হলো- সে অন্যের দোষ গোপন রাখে এবং কাউকে বিব্রত করে না। তাই সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে বা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা ইহকালে অন্যের সম্মানহানি করে এবং পরকালে নিজেকে জবাবদিহিতার মুখে ফেলে। অতীতের সুন্দর স্মৃতিগুলো জনসম্মুখে প্রচার না করে হৃদয়ে সীমাবদ্ধ রাখাই প্রজ্ঞাবান মানুষের কাজ।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর