ইসলামি শরিয়তে পুরুষের জন্য একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে। তবে এই অনুমতি শর্তহীন নয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন কি না- এই প্রশ্নটি সমাজে প্রায়ই আলোচিত হয়। কোরআন ও হাদিসের দলিলের আলোকে শরিয়তের বিধান এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা নিয়েই এই বিশ্লেষণ। ইসলামি শরিয়তের আইনি অবস্থান ও নৈতিক নির্দেশনার পার্থক্য বোঝাই এখানে মূল উদ্দেশ্য।
শরিয়তের মূল অবস্থান: অনুমতি শর্ত নয়, ইনসাফ শর্ত
কোরআন-হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রের আলোকে আলেমদের সর্বসম্মত মত হলো- দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ, কেউ অনুমতি না নিয়েও দ্বিতীয় বিয়ে করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই বিয়ে শুদ্ধ ও বৈধ হবে।
তবে একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে মূল শর্ত হিসেবে আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে যে বিষয়টি আরোপ করেছেন, তা হলো ন্যায়বিচার ও ইনসাফ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটিই।’ (সুরা নিসা: ৩)
এই আয়াতে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতির শর্ত আরোপ করা হয়নি। তবে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায় ও সমতা বজায় রাখতে না পারলে একাধিক বিয়ে করা জায়েজ নয়।
বিজ্ঞাপন
নৈতিক দিক: কেন অনুমতি নেওয়াকে উত্তম বলা হয়
যদিও শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়, তবু ইসলামি শিষ্টাচার ও দাম্পত্য জীবনের সৌহার্দ্য বজায় রাখার স্বার্থে আলেমরা দ্বিতীয় বিয়ের আগে স্ত্রীকে জানানো, তার সঙ্গে পরামর্শ করা এবং সম্ভব হলে অনুমতি নেওয়াকে উত্তম ও বাঞ্ছনীয় বলেছেন।
কারণ, স্ত্রীকে কষ্ট না দেওয়া, তার অনুভূতির প্রতি যত্নশীল থাকা এবং সদাচরণ করা স্বামীর অন্যতম ঈমানি দায়িত্ব। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি তা যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদেরকে ওসিয়ত করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৮৬)
আলেমরা বলেন, স্ত্রীর অজান্তে দ্বিতীয় বিয়ে করলে যে মানসিক আঘাত ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, তা এই হাদিসে নির্দেশিত সদাচরণের পরিপন্থী হতে পারে।
আরও পড়ুন: দুইবার বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর কাছে থাকবে?
উত্তম চরিত্রের মানদণ্ড
নবীজি (স.) স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহারকে মুমিনের চরিত্রের মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন- ‘মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি ঈমানে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (ইবনে হিব্বান: ৪১৭৬)
আরেক হাদিসে পরিবারের প্রতি কোমল আচরণকে প্রকৃত ঈমানের পরিচায়ক বলা হয়েছে। এসব বর্ণনার আলোকে স্ত্রীকে অবহিত রাখা, মানসিকভাবে প্রস্তুত করা এবং তার অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াকে ইসলামি নৈতিকতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সিদ্ধান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনার সারকথা হলো- শরিয়তের আইনি দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয় এবং অনুমতি ছাড়া বিয়েও বৈধ হবে। তবে একাধিক বিয়ের মৌলিক শর্ত হলো- স্ত্রীদের মাঝে পূর্ণ ইনসাফ ও সমতা রক্ষা করা। এ শর্ত পূরণ করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা গুনাহের কারণ।
আরও পড়ুন: বিধবা নারীকে বিয়ে করার সওয়াব
একইসঙ্গে ইসলাম স্বামীকে নৈতিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। স্ত্রীকে কষ্ট না দেওয়া, তার সঙ্গে সদাচরণ করা এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষা করা ঈমানের সৌন্দর্যের অংশ। সে কারণেই দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে জানানো ও তার সম্মতি নেওয়াকে আলেমরা উত্তম ও বাঞ্ছনীয় বলে অভিহিত করেছেন।
মোটকথা, দ্বিতীয় বিয়েতে অনুমতি না নেওয়া শরিয়তবিরোধী নয়, তবে অনুমতি নেওয়া বা স্ত্রীকে আস্থায় নেওয়াই একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয়। শরিয়তের বিধান ও নৈতিকতার এই ভারসাম্যই ইসলামের দাম্পত্য দৃষ্টিভঙ্গিকে মানবিক ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

