ইসলাম এসেছে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচার থেকে মানুষকে মুক্ত করে আলোর পথে পরিচালিত করতে। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর তেইশ বছরের নবুয়তি জীবনে বংশীয় অহংকার, সামাজিক বৈষম্য ও নিষ্ঠুর প্রথাগুলোর মূলোৎপাটন করে এক আদর্শ ভ্রাতৃত্বের সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তবে বিশ্বনবী (স.) তাঁর উম্মতকে আগেভাগেই সতর্ক করে গেছেন- সঠিক ঈমানি চেতনার অভাব হলে জাহেলি যুগের কিছু বদভ্যাস ও সামাজিক ব্যাধি মুসলিম সমাজেও ফিরে আসতে পারে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) এমনই চারটি কুপ্রথার কথা উল্লেখ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সেই অমোঘ ঘোষণা
হজরত আবু মালিক আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলি যুগের চারটি কুপ্রথা রয়ে গেছে, যা তারা (পুরোপুরি) ছাড়তে চাইবে না:
১. বংশের গৌরব করা,
২. অন্যকে বংশের খোটা দেওয়া,
৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির প্রার্থনা করা এবং
৪. মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা।’ (সহিহ মুসলিম: ২০৪৯)
আরও পড়ুন: চুড়ি-নাকফুল না পরলে স্বামীর আয়ু কমে? ইসলাম কী বলে
নিচে এই চারটি ভয়ংকর কুপ্রথা এবং এ সংক্রান্ত দলিলাদি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. বংশের অহংকার ও আভিজাত্যের লড়াই
ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। বংশ বা গোত্র কেবল পরিচয়ের মাধ্যম, গর্ব করার বস্তু নয়। জাহেলি যুগে মানুষ নিজেদের বংশ নিয়ে গর্ব করত এবং অন্যদের ছোট মনে করত। অভ্যাসটি ইসলামের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।’ (সুরা হুজরাত: ১৩)
বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছিলেন- ‘হে লোকসকল! তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে।’
২. অন্যের বংশ ও জাত তুলে নিন্দা করা
কাউকে তার পরিবার, বংশ বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে তুচ্ছজ্ঞান করা বা খোটা দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এটি পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে।
একবার সাহাবি আবু জার (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিলে রাসুলুল্লাহ (স.) রাগান্বিত হয়ে বলেন- ‘হে আবু জার! তুমি কি তাকে তার মায়ের নামে লজ্জা দিলে? তোমার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াত রয়ে গেছে।’ (সহিহ বুখারি: ৩০)
আরও পড়ুন: তিন কু-সংস্কার থেকে বেঁচে থাকলে বিনা হিসাবে জান্নাত
৩. নক্ষত্র বা ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস (কুসংস্কার)
জাহেলি যুগে ধারণা করা হতো, বিশেষ নক্ষত্রের উদয়-অস্ত বা অবস্থানের কারণে বৃষ্টি হয়। বর্তমানে রাশিফল, ভাগ্য গণনা বা জ্যোতিষবিদ্যার ওপর বিশ্বাস রাখা এই কুপ্রথারই আধুনিক রূপ।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ মুমিন হয়েছে, কেউ কাফির। যে বলেছে আল্লাহর অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে সে মুমিন; আর যে বলেছে অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে সে কাফির (বা অকৃতজ্ঞ)।’ (সহিহ বুখারি: ৮৪৬)
৪. শোক পালনে বিলাপ ও বুক চাপড়ানো
স্বাভাবিক কান্না জায়েজ হলেও উচ্চস্বরে চিৎকার করা, বিলাপ করা, কাপড় ছেঁড়া বা নিজের শরীরে আঘাত করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একে হাদিসের ভাষায় ‘নিয়াহা’ বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে, জামার কলার ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো চিৎকার দেয় (বিলাপ করে), সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪)
সহিহ মুসলিমের ২০৪৯ নম্বর হাদিসের শেষে বলা হয়েছে- ‘বিলাপকারী যদি মৃত্যুর আগে তওবা না করে, কেয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় দাঁড় করানো (উঠানো) হবে যে, তার গায়ে আলকাতরার তৈরি জামা এবং খসখসে চর্মরোগের (চুলকানিযুক্ত) একটি বর্ম বা আবরণ থাকবে।’
বংশের দম্ভ, পরনিন্দা, নক্ষত্র-নির্ভর কুসংস্কার এবং বিপদ-আপদে অধৈর্য হওয়া একজন খাঁটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এই চারটি কুপ্রথা আজও আমাদের সমাজে নানাভাবে বিদ্যমান। পরকালীন মুক্তি ও জান্নাত লাভের জন্য আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন থেকে এই জাহেলি আচরণগুলো পুরোপুরি বর্জন করা জরুরি।

