সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে এবং সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে আড়াল হয়ে যায়। চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে এবং চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যায়।
আরবিতে চন্দ্রগ্রহণকে বলা হয় খুসুফ এবং সূর্যগ্রহণকে বলা হয় কুসুফ। এ উপলক্ষে যে নামাজ আদায় করা হয় তাকে বলা হয় সালাতুল কুসুফ বা খুসুফ।
বিজ্ঞাপন
সূর্যগ্রহণের ঘটনায় নবীজির (স.) আমল
দশম হিজরিতে মদিনায় সূর্যগ্রহণ হলে রাসুলুল্লাহ (স.) লোকদেরকে নামাজের জন্য সমবেত করেন এবং দীর্ঘ সময় নামাজ ও দোয়া করেন। হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আমরা নবী (স.)-এর কাছে ছিলাম। সূর্যগ্রহণ শুরু হলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, চাদর টেনে মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আমরাও প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের সঙ্গে দু’রাকাত নামাজ আদায় করলেন সূর্য উদ্ভাসিত হওয়া পর্যন্ত। এরপর বললেন, ‘কারো মৃত্যু বা জীবনের কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখন তোমরা এ ঘটনা দেখবে তখন নামাজ আদায় করবে এবং দোয়া করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৯৮৩)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যখন তোমরা সূর্যগ্রহণ দেখবে, তখন আতঙ্কিত হৃদয়ে আল্লাহর জিকির ও ইস্তেগফারে মশগুল হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৮৯)
আরও পড়ুন: নবীজির মোজেজা: চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
বিজ্ঞাপন
হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (স.) সূর্যগ্রহণ দেখে আশঙ্কা করলেন, কেয়ামত নেমে আসছে। তিনি মসজিদে গিয়ে দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও সেজদাসহ নামাজ পড়লেন। এরপর বললেন, ‘এগুলো আল্লাহর নিদর্শন, কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে নয়। যখন তোমরা তা দেখবে, তখন জিকির ও ইস্তেগফারে ব্যস্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৮৯)
সূর্যগ্রহণকে আনন্দের উপলক্ষ বানানো অনুচিত
বর্তমানে অনেকেই গ্রহণকে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল বা বিনোদনের বিষয় মনে করেন। অথচ রাসুল (স.) এ সময় আল্লাহর ভয়ে বিচলিত হতেন, মসজিদে যেতেন এবং নামাজ আদায় করতেন। তাই মুসলিমদের জন্য এ সময় উপভোগ নয় বরং ইবাদতের সময়।
আরও পড়ুন: সৃষ্টিজগতের রহস্য অনুধাবনে কোরআনের আহ্বান
সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নামাজের পদ্ধতি
- রাকাত সংখ্যা: দুই রাকাত।
- আজান/ইকামত: নেই।
- জামাত: সূর্যগ্রহণের নামাজ মসজিদে জামাতে আদায় করা সুন্নত (মাকরুহ ওয়াক্ত ছাড়া)।
- কেরাত: দিনের নামাজ হওয়ায় কেরাত আস্তে পড়তে হবে।
- পদ্ধতি: দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সেজদা আদায় করা এই নামাজের নিয়ম। প্রথম রাকাতে তেলাওয়াত ও রুকু দ্বিতীয়বারের চেয়ে দীর্ঘ হবে। দ্বিতীয় রাকাতেও একই নিয়ম, তবে সময় কিছুটা কমানো হবে। হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, ‘সূর্যগ্রহণের নামাজ সুন্নত এবং জামাতে আদায় করা উত্তম। প্রতিটি রাকাতে এক রুকু ও দুই সেজদা থাকবে। নামাজশেষে সূর্য সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত দোয়া করতে হবে।’ (হিন্দিয়া: ১/১৫৩; তাতারখানিয়া: ২/৬৫৭, নং ৩৫২২)
তবে প্রত্যেক রাকাআতে ২ রুকু, ৩ রুকু বা ৪ রুকু আদায়ের এক ব্যতিক্রমী নিয়মেও এই নামাজ পাড়ার কথা হদিসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারি: ১০৪৭; আল-মুগনি: ৩/৩২৩; ইমাম নববি, আল-মাজমু: ৫/৪৮)।
সুন্নত আমলসমূহ
- সালাতুল কুসুফ আদায় করা।
- আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফার করা।
- তাওবা করা।
- সদকা করা।
সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহর এক বিশেষ নিদর্শন। এটি মানুষের জন্য আল্লাহর ক্ষমতা স্মরণ করার সুযোগ এবং কেয়ামতের ভীতি জাগ্রত করার একটি মাধ্যম। তাই এ সময় আনন্দে নয়, বরং সালাত, জিকির, দোয়া, তাওবা ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ঝুঁকে পড়াই প্রকৃত সুন্নত আমল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সে তাওফিক দিন। আমিন।
