শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

একটি পরিশুদ্ধ জীবন চাইলে যে আমলগুলো করবেন

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০২৫, ০৯:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

পরিশুদ্ধ জীবনের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫ আমল 
একটি পরিশুদ্ধ জীবন চাইলে যে আমলগুলো করবেন

একটি পরিশুদ্ধ জীবন চাইলে প্রথমেই অতীতের সব ভুল-ভ্রান্তি থেকে তাওবা করে আত্মশুদ্ধির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। কারণ ইহকালীন-পরকালীন সফলতা নির্ভর করে আত্মশুদ্ধির ওপর। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে-ই সফলকাম যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং সে-ই ব্যর্থ যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস: ৯-১০)

আত্মার পরিশুদ্ধি ছাড়া সব আমল বৃথা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা মালের দিকে দেখেন না; বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে’ (মুসলিম: ২৫৬৪; মেশকাত: ৫৩১৪, ‘রিকাক’ অধ্যায়)। অন্য হাদিসে এসেছে,  নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।’ (বুখারি: ৫১৪৪, ৬০৬৬; মুসলিম: ২৫৬৪; তিরমিজি: ১১৩৪; নাসায়ি: ৩২৩৯)

প্রাজ্ঞ আলেমরা আত্মশুদ্ধি তথা পরিশুদ্ধ জীবনের জন্য প্রধান পাঁচটি উপায় বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হলো—

১. পার্থিব মোহ ত্যাগ

ইসলাম মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে উৎসাহিত করলেও দুনিয়ার মোহে অন্ধ হতে নিষেধ করে। কেননা দুনিয়ার মোহ কখনো শেষ হওয়ার নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘বৃদ্ধদের অন্তর দুটি বিষয়ে যুবক থেকে যায়। পার্থিব জীবনের ভালোবাসা এবং দীর্ঘ আশা।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪২০)

এই মোহই মূলত মানুষকে নানাবিদ অন্যায় কাজে লিপ্ত করে। রাসুল (স.) বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের নিয়ে দারিদ্র্যের ভয় করি না। কিন্তু এ আশঙ্কা করি যে, তোমাদের ওপর দুনিয়া এমন প্রসারিত হয়ে পড়বে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর প্রসারিত হয়েছিল। আর তোমরাও দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে, যেমন তারা আকৃষ্ট হয়েছিল। আর তা তোমাদের বিনাশ করবে, যেমন তাদের বিনাশ করেছে। (সহিহ বুখারি: ৩১৫৮)

২. দুনিয়ার প্রকৃত রূপ সম্পর্কে সজাগ থাকা

আল্লাহ পথের সাধকরা যখন দুনিয়ার প্রকৃত রূপ দেখতে পান, তখন তারা পার্থিব জীবনের ব্যাপারে দীর্ঘ আশা পরিত্যাগ করে। শয়তানের ধোঁকার ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকেন। আসলে আত্মার পরিশুদ্ধি ও সুন্দর জীবনের জন্য পৃথিবী ও তার প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানা ও সার্বক্ষণিক সজাগ থাকা উচিত। কেননা শয়তান ও প্রবৃত্তি দুনিয়াকে সুশোভিত করে তোলে। এই বিষয়ে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের দ্বীনকে ক্রীড়া-কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছিল এবং পার্থিব জীবন যাদের প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ আমি তাদের বিস্মৃত হব, যেভাবে তারা তাদের এই দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল এবং যেভাবে তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করেছিল।’ (সুরা আরাফ: ৫১)

পার্থিব জীবনের বাস্তবতা জানার উপায় হলো কোরআন-সুন্নাহর আলোকে প্রতিটি কাজের কারণ ও পরিণতি বিশ্লেষণ করা এবং করণীয় নির্ধারণ করা। ঠিক যেভাবে নবী (স.) বলেন, কেয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহর কাছ থেকে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল কীভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল কী কাজে বিনাশ করেছে? তার ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং তা কী কী খাতে খরচ করেছে? সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মোতাবেক কী কী আমল করেছে? (সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬)

৩. দীর্ঘ আশা পরিত্যাগ

দুনিয়ায় দীর্ঘ আশা মানুষকে পরকাল ভুলিয়ে দেয়; নেক কাজে গাফেল করে রাখে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, দুনিয়ায় কম উপার্জন করো যেন স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারো, পাপ কমিয়ে আনো যেন মৃত্যু সহজ হয়, তুমি তোমার পিতাকে কোথায় রেখে এসেছ তা খেয়াল করো। কেননা তোমার শিরা-উপশিরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। (মুসনাদে শিহাব: ৬৩৮) আরও বর্ণিত হয়েছে ‘হে লোকেরা! নিশ্চয়ই সময় গুটিয়ে যাচ্ছে, বয়স নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, কালের পরিক্রমায় দেহ ক্ষয় হচ্ছে, রাত-দিন পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাত-দিন বহু দূরবর্তী বিষয়কে নিকটবর্তী এবং সব নতুন বিষয়কে পুরাতন করে দিচ্ছে। এ অবস্থায় হে আল্লাহর বান্দারা, কুপ্রবৃত্তির ব্যাপারে উদাসীন হয়ো না এবং স্থায়ী নেক আমলে আগ্রহী হও।’ (সিরাজুল মুলুক: ১/৯৫)

৪. আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা

সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা এবং ছোট-বড় গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য অন্যতম আমল। তাকওয়ার পরকালীন ফায়দা অশেষ। দুনিয়াতেও আল্লাহভীতির অসংখ্য পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে পবিত্র কোরআনে। তাছাড়া স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের সঙ্গী হয়ে যান। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেজগার এবং যারা সৎকর্ম করে।’ (সুরা নাহল: ১২৮)

ছোট-বড় সবরকম গুনাহ থেকে মুক্ত থাকতে উৎসাহিত করতেন নবীজি। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘হে আয়েশা! তুচ্ছ গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকো। কেননা উক্ত পাপগুলির খোঁজ রাখার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে অনুসন্ধানকারী (ফেরেশতা) নিযুক্ত রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ: ৪২৪৩; মেশকাত: ৫৩৫৬) আনাস (রা.) বলেন, ‘(হে লোকসকল!) তোমরা এমন এমন কাজ করে থাক, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চাইতে সূক্ষ্ম। অথচ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জামানায় আমরা সেগুলোকে ধ্বংসাত্মক মনে করতাম।’ (বুখারি: ৬৪৯২; মেশকাত: ৫৩৫৫।

৫. সবসময় পরকালের কথা স্মরণ রাখা

মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং মৃত্যু, কবর, হাশর, জাহান্নামকে স্মরণ করার মধ্যেই রয়েছে আত্মাকে কলুষমুক্ত রাখার সর্বোত্তম উপায়। তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কারের ঘোষণা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘...যারা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা বাকারা: ৬২)

পরকালের স্মরণকারীরাই প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিমান। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল, দুনিয়াতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি কারা? তিনি জবাব দিলেন, যারা মৃত্যুর কথা অধিক পরিমাণে স্মরণ করে এবং তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। দুনিয়া-আখেরাতে তারাই সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরিহিত হবে। (মুজামুল কাবির: ১৩৫৩৬)

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষের হিসেব-নিকেশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।’ (সুরা আম্বিয়া: ১)

আলোচ্য আমলগুলোকে আত্মশুদ্ধির জন্য দুনিয়াকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং জীবন যাপন কীভাবে হবে তারই এক সংক্ষিপ্ত প্যাকেজ বলা যায়। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উপরোক্ত আমলগুলো করার মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর