রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ঢাকা

লেবারের ঘাঁটিতে অ্যাসপায়ারের উত্থান, নেতৃত্বে লুৎফুর রহমান

মো. মুন্না মিয়া, লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
প্রকাশিত: ১০ মে ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

lutfor
চতুর্থবারের মতো মেয়র হয়েছেন লুৎফুর রহমান। ছবি: ঢাকা মেইল

যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলসহ পুরো পূর্ব লন্ডন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। মূলত এ দলের স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বে ছিলেন অ-বাংলাদেশি রাজনীতিকরা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা।

এই পরিবর্তনের নেতৃত্বে রয়েছেন মেয়র লুৎফুর রহমান। ব্রিটেনের প্রথম বাংলাদেশি মেয়র হিসেবে পরিচিত লুৎফুর রহমান এনিয়ে চারবার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


শুধু মেয়র পদেই নয়, তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল অ্যাসপায়ার পার্টি কাউন্সিল নির্বাচনেও বড় সাফল্য পায়। ৪৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতে জয় পেয়ে লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের ঘাঁটিতে নিজের দখলে নেয় এবং পূর্ব লন্ডনে মেয়র লুৎফুর রহমানের উত্থান জানান দেয়।

শনিবার (৯ মে) পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৪৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টি আসন দখলে নেয় মেয়র লুৎফুর রহমানের জোট অ্যাসপায়ার পার্টি। অন্যদিকে ৫টি করে পেয়েছে লেবার পার্টি ও গ্রিন পার্টি অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস। এছাড়া লিবারেল ডেমোক্র্যাটস এবং কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে একটি করে আসন।

আরও পড়ুন

টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র পদে ফের লুৎফুর রহমানের জয়

এই ফলাফল শুধু একটি স্থানীয় নির্বাচনি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি পূর্ব লন্ডনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে অ্যাসপায়ারের উত্থান এখন ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।


বিজ্ঞাপন


ফের নির্বাচিত মেয়র লুৎফুর রহমান

পুনরায় টাওয়ার হ্যামলেটস বারার নির্বাহী মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান। তিনি প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মেয়রপ্রার্থী সিরাজুল ইসলামকে পরাজিত করেন।

Lutfor2

ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, অ্যাসপায়ার পার্টির লুৎফুর রহমান পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট, যা মোট ভোটের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট, যা মোট ভোটের ২১ দশমিক ১ শতাংশ।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা গ্রিন পার্টির হিররা খান আদেওগুন পেয়েছেন ১৯ হাজার ২২৩ ভোট, যা মোট ভোটের ২০ দশমিক ৯ শতাংশ।

পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর লুৎফুর রহমান স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে জনগণ আবারও আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। তাই আমি আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভয় ও বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে মানুষ আশার রাজনীতিকে বেছে নিয়েছে।’

আরও পড়ুন

লন্ডনে ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশি মেয়র ফরহাদ হোসেন

লুৎফুর রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁর ভুয়া ভিডিও তৈরি করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।

এছাড়া এক সাবেক কনজারভেটিভ এমপি শ্বেতাঙ্গ ও ‘অ-বাংলাভাষী’ ভোটারদের তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

লুৎফুর রহমান বলেন, ‘চরম ডানপন্থার উত্থানের এই সময়ে টাওয়ার হ্যামলেটস যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে গর্ব করতে পারে।’

যেভাবে টাওয়ার হ্যামলেটসের ক্ষমতার কেন্দ্রে লুৎফুর রহমান

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লুৎফুর রহমানের শিকড় সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায়। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বেড়ে ওঠার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় যুক্ত হন এবং একজন সলিসিটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে কমিউনিটির কল্যাণে কাজ করার তাগিদে লেবার পার্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর উত্থান শুরু হয়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, মসজিদভিত্তিক সামাজিক কার্যক্রম, যুব উন্নয়ন ও অভিবাসী অধিকার নিয়ে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা পান। তিনি প্রথমে ২০০২ সালে এবং পরে ২০০৬ সালে লেবার পার্টির মনোনয়নে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

Lutfor3

পরে দলীয় বিরোধের জেরে ২০১০ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে প্রথমবারের মতো টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন। ব্রিটেনে প্রথম বাংলাদেশি ও বর্ণবাদী সংখ্যালঘু মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি মূলধারার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও চমকে দেন।

কেন জনপ্রিয় লুৎফুর রহমান?

সমর্থক ও বারার বাসিন্দাদের মতে, লুৎফুর রহমানের জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো তিনি সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি, মুসলিম, আফ্রিকান ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। ক্ষমতায় থাকাকালীন কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এর মধ্যে রয়েছে-

* দরিদ্র পরিবারের জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স সহায়তা বৃদ্ধি

* শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়তা ভাতা ও ফ্রি স্কুল মিল চালু রাখা

* প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে সেবা সম্প্রসারণ

* কাউন্সিল হাউজিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্বল্প আয়ের বাসিন্দাদের জন্য আবাসন সহায়তা জোরদার

আরও পড়ুন

লেবারের ৩০ বছরের দুর্গ ভাঙলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রতন

* স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি

* কমিউনিটি সেন্টার ও লাইব্রেরি রক্ষায় উদ্যোগ

Lutfor4

* বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়াতে কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ

* স্থানীয় ছোট ব্যবসা, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও অভিবাসী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।

* টাওয়ার হ্যামলেটসে গণশুনানি ও সরাসরি জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ

সমর্থকরা দাবি করেন, এসব নীতির কারণে বহু নিম্ন আয়ের পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়েছে। এজন্য অনেকেই তাকে ‘জনগণের মেয়র’ বলেও আখ্যা দেন।

বিতর্ক, অপসারণ ও নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরা। ২০১৪ সালের মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০১৫ সালে আদালতের রায়ে তার নির্বাচন বাতিল হয় এবং কয়েক বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সে সময় বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার হয়তো সেখানেই শেষ। কিন্তু কয়েক বছর পর নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অ্যাসপায়ার গঠন করে তিনি আবার মাঠে নামেন।

২০২২ সালের নির্বাচনে অ্যাসপায়ার নাটকীয় সাফল্য অর্জন করে। দলটি ২৪টি আসন জিতে কাউন্সিলের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে এবং লুৎফুর রহমান আবারও সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন।

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর