১০ ডিসেম্বর কী বার্তা দেবে বিএনপি?

প্রকাশিত: ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৫৮ এএম
১০ ডিসেম্বর কী বার্তা দেবে বিএনপি?

বিএনপির দশটি সাংগঠনিক বিভাগের কর্মসূচি শেষ হচ্ছে আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে। বিভাগীয় শহরের মহাসমাবেশগুলোতে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি বিএনপিকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকার মহাসমাবেশে ২০ লাখ লোকের জড়ো করার প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। আর এই সমাবেশ ঘিরেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতির মাঠ।

এই সমাবেশ সফল করতে বিএনপি সারা দেশ থেকে তাদের নেতাকর্মীদের এক সপ্তাহ আগেই রাজধানীতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। দলটির শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে চায় কিন্তু বাধা দিলে প্রতিরোধ করা হবে।

১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশ থেকে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচিও ঘোষণা করবে বিএনপি। যদিও নতুন কর্মসূচির বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি দলটির কোনো নেতা। তবে জানা গেছে, মহাসমাবেশ থেকে বিক্ষোভ মিছিল, লং মার্চ, হরতাল, পথসভা, অবরোধসহ সিরিজ কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। এছাড়া লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণাও আসতে পারে।

এই মহাসমাবেশে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও অংশগ্রহণ করবে। ফলে মহাসমাবেশে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখাও তুলে ধরা হতে পারে। এছাড়া ক্ষমতায় এলে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে কিভাবে পরিবর্তন করা হবে তার খসড়াও তুলে ধরা হতে পারে।

আরও পড়ুন: এবার ‘অগ্নিপরীক্ষায়’ বিএনপির ঢাকার নেতারা

সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ১২ অক্টোবর থেকে বিভাগীয় কর্মসূচি পালন শুরু করে বিএনপি। জ্বালানি তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং নেতাকর্মীদের নিহত হওয়ার প্রতিবাদ, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এ কর্মসূচি চলছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট ও কুমিল্লায় বিভাগীয় সমাবেশ করেছে দলটি। আগামী শনিবার (৩ ডিসেম্বর) রাজশাহীতে গণসমাবেশ করবে। সবশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে বিএনপির কর্মসূচি শেষ হবে।

bnp2

এদিকে ঢাকায় সমাবেশের জন্য ২৬ শর্তে বিএনপিকে অনুমতি দিয়েছি ডিএমপি। সেখানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কথা বলা হলেও বিএনপি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে।‌

এ বিষয়ে বুধবার সরকারের উদ্দেশ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলছি, আপনারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন, জনগণের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। এখানে (নয়াপল্টন) আমরা সমাবেশ করব, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। সে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব আপনাদের।

আরও পড়ুন: জামায়াত নিয়ে টুকুর বক্তব্যে বিএনপিতে অস্বস্তি

তবে শেষ পর্যন্ত দুই স্থানের যেখানেই মহাসমাবেশ হোক, এর মধ্য দিয়ে বড় শোডাউনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। শুধু ঢাকা বিভাগ নয়, সারা দেশ থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো করে মহাসমাবেশ সফল করতে কাজ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

সূত্র জানায়, সমাবেশ থেকে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, খালেদা জিয়াসহ বিরোধীদলীয় সব নেতাকর্মীর মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবিতে আল্টিমেটাম দেওয়ার চিন্তা রয়েছে দলটির। এছাড়া সমাবেশে বাধা দিলে সারা দেশ অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

সমাবেশের আগে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনার বিষয়ে বিএনপির নেতারা জানান, আগের সমাবেশগুলোর কথা মাথায় রেখে এক সপ্তাহ আগেই রাজধানীতে নেতাকর্মীদের নিয়ে আসা হবে। ঢাকায় এসে নিরাপদে আত্মীয়-স্বজনের বাসায়, হোটেলে থাকতে বলা হয়েছে। যাদের থাকার স্থান নেই তাদেরকে অন্য নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে রাখার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

সমাবেশসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, আমাদের সমাবেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সরকার আতঙ্কিত। ঢাকার সমাবেশ সরকার কিছুতেই বন্ধ করতে পারবে না। কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ শপথ নিয়েছি। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন অনিবার্য। জনগণ পাশে থাকলে কোনো অপশক্তি আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না, আমাদের পথ রুদ্ধু করতে পারবে না।

আরও পড়ুন: বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা কতদূর?

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, বিগত সমাবেশগুলোর আগে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া, বাধা দেওয়া ছাড়াও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা ধরে নিতে পারি ঢাকার শহরে সেই একই কাজ করা হবে। কিন্তু নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আস্থা ও সাহস রয়েছে তাতে মনে হয় না কোনো বাধা দিয়ে আমাদেরকে আটকাতে পারবে। যতই বাধা আসুক না কেন আমাদের সমাবেশ সফল হবে। আমি বিশ্বাস করি সেটা মহাসমাবেশে পরিণত হবে। ঢাকার সমাবেশ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করবে। আমরা জনগণকে নিয়েই মাঠে নামব, এটাই আমাদের শক্তি।

ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে চাই। যদি কোনো বাধা দেওয়া হয় তাহলে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের বিভাগীয় সব কর্মসূচিতে তারা ঝামেলা করছে। কিন্তু আশা করছি ঢাকায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে পারব। সরকার ও প্রশাসন গায়ের জোরে সবকিছু করছে। ইনশাল্লাহ আমরা সমাবেশ করব যেকোনো মূল্য। আমাদেরকে মাঠে নামতে দেবে না? আমরা তো ইতিমধ্যে মাঠেই রয়েছি। আর জনগণকে নিয়েই মাঠে থাকব।

bnp3

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশ সব রেকর্ড ভঙ্গ করবে। জনগণ এই সরকারের সাথে নেই। জনগণ এখন প্রতিবাদী হয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিও জনগণের একটি অনাস্থা এসে গেছে, কেন তারা এই সরকারকে নামাচ্ছে না। সরকার কেন এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলার আহ্বায়ক খায়রুল কবির খোকন ঢাকা মেইলকে বলেন, মানুষ এখন মুক্তি চায়। বাধা দিয়ে গণপরিবহন বন্ধ করে সমাবেশ বন্ধ করা যাবে না। দেশ গণঅভ্যুত্থানের দিকে যাচ্ছে। জনগণ নেমে গেছে, রাজপথ দখল করেই দাবি আদায় করা হবে। এই স্বৈরাচারের হাত থেকে মানুষ মুক্তি চায়। বাধা দিলে সরকারের পতন আরও ত্বরান্বিত হবে। পতন ঠেকানোর জন্য এখন তারা উন্মাদ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপি

মহাসমাবেশ থেকে কি ধরনের বার্তা দেওয়া হতে পারে- জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা আমাদের দাবি-দাওয়াগুলো মানুষের কাছে বলছি, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছি। আমরা দাবিগুলো সরকারের কাছে জানাচ্ছি। সরকার মানলে ভালো কথা, না মানলে আন্দোলন চালিয়ে যাব। ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি অবশ্যই আসবে। সেই কর্মসূচি কোন ধরনের হবে তা রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বলে দেবে।

আরও পড়ুন: ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সেক্রেটারিরা কে কোথায়?

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জনগণ রাস্তায় নেমে গেছে। মানুষ তাদের জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। দেশের মানুষ যখন সিদ্ধান্ত নেয় তখন সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশের মানুষ সরকার পতনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরকার পতনের জন্য যে সিদ্ধান্তের প্রয়োজন সে সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে। ভয়-ভীতির সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়। কিন্তু সম্ভব নয়।

এদিকে সমাবেশ সফল করার জন্য অভ্যর্থনা উপ-কমিটি, ব্যবস্থাপনা উপ-কমিটি, শৃঙ্খলা উপ-কমিটি, প্রচার উপ-কমিটি, মিডিয়া উপ-কমিটি, যোগাযোগ উপ-কমিটি, সাংস্কৃতিক উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রস্তুতি কমিটির মূল দায়িত্বে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।

এমই/জেএম