মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০২৪, ঢাকা

এবার ‘অগ্নিপরীক্ষায়’ বিএনপির ঢাকার নেতারা

মো. ইলিয়াস
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:১২ এএম

শেয়ার করুন:

এবার ‘অগ্নিপরীক্ষায়’ বিএনপির ঢাকার নেতারা

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। দণ্ডের কারণে দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও বিদেশে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনীতিতে ‘সক্রিয় অনুপস্থিতিতে’ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দলটির শীর্ষ নেতাদের।

নেতৃত্বের এমন সংকট ছাড়াও মামলা-হামলাসহ নানামুখী চাপের কারণে দীর্ঘ সময়েও ‘ঘুরে দাঁড়াতে’ পারছে না একাধিকবার দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্যতম বৃহৎ দলটি। সব বাধা-বিপত্তির পরে এখনও রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি।

সামনে জাতীয় নির্বাচন। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময়ও বলে দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। এমন পরিস্থিতিতে দলকে সুসংগঠিতের পাশাপাশি কীভাবে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে ‘অগ্নিপরীক্ষায়’ পড়েছে দলটির ঢাকার নেতারা। যদিও হামলা-মামলার মুখেও আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন নেতারা।

দেশ 'গণতন্ত্রহীন' দাবি করে 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার' করতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে জনমত তৈরি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করা সামনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শীর্ষ নেতারা।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধী ডান-বাম ঘরানার দলগুলোকে এক সূত্রে গেঁথে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টায় আছে বিএনপি। যে ঐক্যের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন গড়তে চায় দলটি। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ২২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকও করেছে তারা। এমনকি সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে ঐক্যও জানিয়েছে সমমনা দলগুলো।

গত ২২ আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে দলটির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন। এসব কর্মসূচি পালনে তারা সফল হয়েছেন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি। এবার রাজধানী ঢাকাকে জাগিয়ে তুলতে চাইছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। অতীতে আন্দোলন সংগ্রামে রাজধানী ঢাকায় ভিত গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতার গ্লানি রয়েছে। এবার সেই ব্যর্থতা কাটানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি।

দলটির নেতারা মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা, মামলা, গ্রেফতার ও গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যাসহ দেড় হাজারের অধিক নেতাকর্মীকে আহত করেও চলমান আন্দোলন দমাতে পারেনি। বরং অতীতের তুলনায় সাহসী ভূমিকা রাখায় দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম তৃণমূলকে বাহবা দিয়েছে।

দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানেও তাদের সফল বলা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা মহানগরকেও জাগিয়ে তুলতে চায় বিএনপি। তাই অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি কাটিয়ে উঠতে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে ঢাকা মহানগরীর নেতারা।

নিত্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২২ আগস্ট থেকে সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। তৃণমূলে চলমান কর্মসূচি শনিবার ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে।

এদিকে আন্দোলনকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে নতুন আন্দোলন সংগঠিত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি ১৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে সমাবেশ করে আসছে ঢাকা মহানগর বিএনপি। তাই শীর্ষ নেতারা প্রেসক্লাব এবং নয়াপল্টনের বাইরে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

চলমান আন্দোলনে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কর্মসূচিতে সন্তুষ্ট হলেও ঢাকা মহানগর‌ থানা বা ওয়ার্ড এলাকায় নেতাকর্মীদের ভূমিকায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব হতাশ। সামনে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার আগে ঢাকা মহানগর নিয়ে ভাবছে নেতৃবৃন্দ।

২০১৪ সালের পরে দলটি ঢাকা মহানগরে আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই ঢাকা মহানগর উত্তর দক্ষিণ বিএনপিতে আনা হয়েছে নতুন নেতৃত্ব। এছাড়া সারাদেশের নেতৃবৃন্দ ঢাকা মহানগরের আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাই‌ চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার আগে এবার ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের নেতাদের পরীক্ষা দিতে হবে।

ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানার পাশাপাশি সারাদেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ধরে রাখতে বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচি বিভাগীয় সদর ও জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। সর্বশেষ ঢাকায় একটি বিশাল সমাবেশ করারও চিন্তা করছেন তারা।

দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বৈঠক করে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখনো জাতীয় নির্বাচনের ১৬ মাস বাকি। তাই এখনই বড় আন্দোলন করতে গ্রেফতার-হামলা মামলার আশঙ্কা রয়েছে। সেজন্যই দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনোই বড় আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছে না বলে জানা গেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারি বা তার পরে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার চিন্তা রয়েছে দলটির। কঠোর আন্দোলনের যাওয়ার পূর্বে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার জন্য আন্দোলন চলমান রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় গত শনিবার থেকে ১৮ দিনব্যাপী ঢাকায় সমাবেশ কর্মসূচি শুরু করেছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬টি স্পটে এসব সমাবেশ হবে।

বিষয়টি অবহিত করে বিএনপির উভয় ইউনিটই ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। গত শনিবার ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম দিন বেলা ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে প্রথম সমাবেশ শুরু হয়।

দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বৈঠক করে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখনো জাতীয় নির্বাচনের ১৬ মাস বাকি। তাই এখনই বড় আন্দোলন করতে গ্রেফতার-হামলা মামলার আশঙ্কা রয়েছে। সেজন্যই দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনোই বড় আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছে না বলে জানা গেছে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সাধারণ মানুষের দাবি দাওয়া নিয়ে তাদের এই কর্মসূচি। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন বলে তাদের দাবি। চলমান আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা মহানগরেও একইভাবে জনগণের সাড়া পাবেন বলে প্রত্যাশা তাদের।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা যে দাবি নিয়ে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছি তাহলো নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ। এর পাশাপাশি জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকারের কোনো চিন্তা নেই, তারা ব্যস্ত আগামীতে কীভাবে আবার বিনা ভোটে সব দলকে বাইরে রেখে নির্বাচিত হওয়া যায়। এটার জন্য আমরা জনগণের কাছে যেতে চাই, দাবি দাওয়া নিয়ে জনগণ সোচ্চার হয়ে মাঠে নামবে। ধ্বংসাত্মক কোনো কার্যকলাপ করছি না। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছি। শান্তিপূর্ণভাবে মাঠে অবস্থান করতে চাই, যাতে সরকার পুলিশ বাহিনীকে আমাদের ওপর উঠিয়ে না দেয়।’

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, আমাদের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনগণের সাড়া যাতে না আসে এজন্য সরকার মিছিল দেখলেই গুলি করছে টিয়ারশেল মারছে। গুলি করা টিয়ারশেল মারা সরকার এগুলো বন্ধ করুক। তারা যদি জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চায় তারাও মিছিল করুক মিটিং করুক তাদেরকে কে বাধা দেবে? আমাদের মিছিল মিটিংয়ে কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে? তারা যাচাই করুক জনগণ তাদের পক্ষে না আমাদের পক্ষে। একটামাত্র জনসভা করলাম তাতে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানুল্লাহ আমান ঢাকা মেইলকে বলেন, জ্বালানি তেল, নিত্যপণ্যের ঊধর্বগতি এবং ভোলায় নুরে আলম, আব্দুর রহিম ও নারায়ণগঞ্জে শাওন প্রধান হত্যার প্রতিবাদে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে এসব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকা মহানগর বিএনপি কর্মসূচিতে কতটা সফল হতে পারবে জানতে চাইলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকা মেইলকে বলেন, এটা গণতান্ত্রিক সরকার নয়। তান্ত্রিক সরকার হলে তাদের জবাবদিহিতা থাকে, ব্যর্থতা স্বীকার করে, ব্যর্থতা নিয়ে পদত্যাগ করে, নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। এটা একটি ফ্যাসিস্ট সরকার।

দুদু বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের লোডশেডিং, গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আমরা সারাদেশে কর্মসূচি পালন করেছি। এতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগরে কর্মসূচি শুরু হয়েছে। মূলত সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে আমাদের এই কর্মসূচি। আশা করি ঢাকাতে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে এখানেও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়বে। সাধারণ মানুষ আসলে অনেক কষ্ট রয়েছে। তারা তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়। কিন্তু সরকার দমন নিপীড়ন করে মানুষকে চাপে রাখতে চায়। এই ভয়কে জয় করে যখন মানুষ মাঠে নামবে তখনই সফলতা অর্জন হবে।

এমই/এমআর

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর