কৃষকের অধিকার, সামাজিক ন্যায় ও ইনসাফের সংগ্রামে পীর মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া আজও প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ।
তিনি বলেন, দুদু মিয়া আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের অন্যতম পূর্বসূরি। অথচ পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ঐতিহাসিক ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের আড়াল করে রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জেডিপি কার্যালয়ে ‘মহা বিপ্লবী মুহসীনউদ্দীন দুদু মিয়ার ১৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নাঈম আহমাদ বলেন, ‘জেডিপি আমাদের লড়াই-সংগ্রামের সব বীরকে অব্যাহতভাবে স্মরণ করবে। বিশেষ করে দুদু মিয়া কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি শুধু একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের নেতা ছিলেন না; তাঁর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলন পূর্ববাংলার কৃষকসমাজের ওপর জমিদারি ও ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধেও শক্তিশালী প্রতিরোধে রূপ নেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে কৃষকের ন্যায্য অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দুদু মিয়ার সংগ্রাম থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার আছে। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের চেতনা ধারণ করে আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।’
প্রধান আলোচক বাংলাদেশ আজাদ পার্টির মহাসচিব মুন্সি বোরহান মাহমুদ বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ইতিহাসের ওপর এক ধরনের সেন্সর আরোপ করে অনেক বীরকে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছে।
তাঁর দাবি, দুদু মিয়া থেকে শুরু করে অসংখ্য মুসলিম বীরের অবদান পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রাখা হয়েছে অথবা খুব সীমিত পরিসরে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ফকির মজনু শাহের আন্দোলনকে ‘ফকির বিদ্রোহ’ বলা হয়েছে। মুসলমানরা ‘বিদ্রোহী’, আর প্রীতিলতারা ‘বিপ্লবী’—এই ধরনের উপস্থাপনার মধ্যেও একটি বৈষম্যমূলক ন্যারেটিভ কাজ করেছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের মহানায়কদের আড়াল করে ফেলা হয়েছে। এটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ।’
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনি ইহসান বলেন, ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নিজেদের ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘দুদু মিয়া ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলন নিজস্ব সাংগঠনিক ও বিচারব্যবস্থার কাঠামো গড়ে তুলেছিল। ফলে ইংরেজ ও জমিদারি কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের অধ্যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুদু মিয়ার সংগ্রামকে শুধু ধর্মীয় আন্দোলনের ইতিহাস হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক ও কৃষকভিত্তিক ভূমিকা আড়াল হয়ে যায়। তাঁকে কৃষকসমাজের অধিকার ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাসের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।’
সিএইচটি সম্প্রতি জোটের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াইচিং মং শাক বলেন, দুদু মিয়া ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতার একটি ঐতিহাসিক মিল তিনি দেখতে পান।
তিনি বলেন, ‘দুদু মিয়া ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁর লড়াইয়ের সঙ্গে আমি একটি মিল খুঁজে পাই। পার্বত্য অঞ্চলকে এখনো একখণ্ড ব্রিটিশের মতো করে রাখা হয়েছে। এটাকে একখণ্ড বাংলাদেশে পরিণত করতে হবে। আমাদের ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের অনেকের রক্তে এখনো ব্রিটিশ রয়ে গেছে। সেই মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে সবাইকে বাংলাদেশি হয়ে উঠতে হবে।’
উল্লেখ্য, মুহসীনউদ্দীন আহমদ দুদু মিয়া (১৮১৯–১৮৬২) ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহর পুত্র। ১৮৪০ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ফরায়েজি আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার, জমিদারি নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ রূপ নেয়। সরকারি শিক্ষক বাতায়নেও তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও পূর্ববাংলার নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ইয়াসিন আরাফাত রাজের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জেডিপির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইমরান হোসেন রাহাত, বাংলাদেশ গ্রিন পার্টির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ইউসুফ আম্মার, জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার আয়মান আন্দালিব ও আব্দুল হামিদ এবং জাতীয় ছাত্রমঞ্চের সদস্যসচিব আহনাফ আতিফ।
এমআর/এএম




