বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শরিয়া বিরোধী হেবা আইন বাতিল করতে হবে: ফয়জুল করীম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

শরিয়া বিরোধী হেবা আইন বাতিল করতে হবে: ফয়জুল করীম
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। ছবি: সংগৃহীত

হেবা আইন সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহর বিধানে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে দাবি করে সংশোধিত আইনটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এ দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে ‘হেবা আইনের বিতর্কিত সংশোধন প্রসঙ্গে শরিয়াহ ও আমাদের অবস্থান’ শীর্ষক লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়।

এতে বলা হয়, গত ৮ সেপ্টেম্বর সংসদে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী হিসেবে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে। 

ইসলামী আন্দোলনের দাবি, এই সংশোধনীর মাধ্যমে কুরআনে বর্ণিত ইসলামের একটি অকাট্য বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ায় তাদের ধর্মীয় বিধান পালনে সহায়তা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই নাগরিকদের ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো আইন সরকার করতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি ইসলামী শরিয়াহতে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরিবারের বিভিন্ন স্তরের উত্তরাধিকারীদের অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এর বাইরে নতুন কোনো পদ্ধতি সংযোজনের প্রয়োজন বা সুযোগ নেই।’

ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির বলেন, ‘শরিয়াহর উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটিয়ে সন্তানদের নামে সম্পত্তি ‘হেবা’ করার প্রবণতা সমাজে রয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা জীবদ্দশায়ই নিজেদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত বা উচ্ছেদ হচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাদের গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার মূল কারণ শরিয়াহর উত্তরাধিকার বিধান এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। তাই এর সমাধান করতে গিয়ে আবার শরিয়াহর বিধান পরিবর্তন করা যাবে না। সমস্যা সমাধানের জন্য সামাজিক ও আইনগতভাবে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’

হেবা-সংক্রান্ত সংশোধনীর বিষয়ে সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হেবা সংক্রান্ত আইন বহাল রেখে দানের আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু একটি মুসলিম দেশে শরিয়াহসমর্থিত বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, ইসলামে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অধিকার আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সুনানে তিরমিযির ২১২০ নম্বর হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। তার দাবি, আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার বাতিল বা পাশ কাটানোর চেষ্টা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয়।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শরিয়াহ-সংক্রান্ত একটি বিষয়ে দেশের আলেম-উলামাদের মতামত উপেক্ষা করে খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। দলটির মতে, এটি দেশের ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতি উপেক্ষার শামিল এবং এর মাধ্যমে দেশের উলামায়ে কেরামকে অপমান করা হয়েছে।

বাবা-মাকে হেবা করা সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা রোধে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন মুফতি ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক চেতনা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রয়োগেরও দাবি জানান তিনি। তার মতে, অনেক বাবা-মা সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, আইনটি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আরও মার্জিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী ব্রিটিশ ও পশ্চিমা আইনে অভিজ্ঞ হতে পারেন, তবে শরিয়াহ আইন ও এর প্রয়োগ সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের প্রজ্ঞা বেশি। তাই শরিয়াহ-সংক্রান্ত বিষয়ে আলেমদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশের চলমান বিভিন্ন সংকটের কথাও তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা। তিনি বলেন, বেকারত্ব বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ সংকটে মানুষ নাজেহাল। এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে সরকার শরিয়াবিরোধী আইন প্রণয়নে এগিয়ে যাওয়ায় তারা হতাশ।

তবে সরকারের সদিচ্ছার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সম্ভবত গভীরভাবে পর্যালোচনা না করেই আইনটি আনা হয়েছে। সরকারকে আইনটি নিয়ে আরও পর্যালোচনা এবং উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার দাবি জানিয়ে বলেন, সমস্যা সমাধানের নামে কোনো অবস্থাতেই শরিয়াহ অমান্য করা যাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আগামীকাল শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দেশের সব বিভাগীয় শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।

এম/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর