শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব শেখ ফজলুল করিম সেলিম পালন করবেন—এমন বক্তব্য সামনে আসার পর দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা কোনো মতেই শেখ সেলিমকে আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতা হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না।
সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এ বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
এরই মধ্যে ভারতের কলকাতায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বৈঠকেও শেখ সেলিমকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় ওই বৈঠক হয় বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়।
ওিই বৈঠকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ ৮-১০ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ সেলিমকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি প্রকাশ করেন কয়েকজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কার্যক্রমে শেখ সেলিমের অনুপস্থিতি এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
একজন নেতা বৈঠকে শেখ হেলালের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন বলে সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, শেখ সেলিম ছাড়া দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্য থেকেও কাউকে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন
হাসিনার অনুপস্থিতিতে কে ধরবেন আ.লীগের হাল, পাওয়া গেল ইঙ্গিত
আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট
তবে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা কাউকে নতুন করে দলের সভাপতি বানানোর ঘোষণা দেননি। তিনি আওয়ামী লীগের গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মারা গেছেন, অনেকে কারাগারে রয়েছেন। এ অবস্থায় সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য হিসেবে শেখ সেলিম বিভিন্ন দলীয় সভায় সভাপতিত্ব করছেন।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনও বলেছেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সভাপতির অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্যই সভায় সভাপতিত্ব করেন। সেই হিসেবে শেখ সেলিমই বর্তমানে জ্যেষ্ঠতম সদস্য।
সভাপতিমণ্ডলীতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মতিয়া চৌধুরীর পরেই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের অবস্থান ছিল। ওই দুজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। ফলে বর্তমান সভাপতিমণ্ডলীতে শেখ সেলিমই জ্যেষ্ঠতম সদস্য।
শেখ সেলিমকে নিয়ে নতুন বিতর্কের আরেকটি কারণ হলো—দলটির একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির নেতৃত্বে পরিবর্তন ও পুনর্গঠন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জয় ছাড়াও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসে। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন—এমন বক্তব্য সামনে আসায় দলের একটি অংশের প্রত্যাশা ও বাস্তব নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
রাজনীতিতে আ.লীগের ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করলেন তথ্য উপদেষ্টা
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকাকে ‘স্পষ্ট বার্তা’ দিল্লির
দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে শেখ সেলিমকে ঘিরে এক ধরনের বিভক্ত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একটি অংশ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শেখ পরিবারের সদস্য হিসেবে দলের প্রতি ভূমিকার কথা তুলে ধরে তাকে সমর্থন করছে। অন্য একটি অংশ তার সাংগঠনিক ভূমিকা, গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে এনে আপত্তি জানাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মজিবর রহমান চৌধুরীর মতে, শেখ সেলিম আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত ও দীর্ঘদিনের নেতা হলেও নতুন সময় ও নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে তার নাম কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি মনে করেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের যে প্রবণতা রয়েছে, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেখান থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
জেবি




