ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দুই বছর আগে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে ফেরত দিতে বাংলাদেশ বারবার অনুরোধ জানিয়ে আসছে ভারতের কাছে। এবার দেশটি স্পষ্ট করে ঢাকাকে জানিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর বা প্রত্যর্পণ করা হবে না। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে ফিরে গ্রেফতার হলে তার নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্যও বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বাংলাদেশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয় এবং তাকে প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৈঠকে ভারতীয় গোয়েন্দা প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে জানায়, নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করবে না। এমনকি কোনো অবস্থাতেই তাকে হস্তান্তর না করার বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়
ভারতের অবস্থানের পেছনে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, ভারতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রত্যর্পণের অনুরোধ বিবেচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হস্তান্তরের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং তার পরিণতি বিবেচনা করা ভারতের অবস্থানের অংশ বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আনন্দবাজারের দাবি, শেখ হাসিনা নিজেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে ভারত সরকারও অবগত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনার সঙ্গে যেন কোনো ধরনের ‘অসম্মানজনক আচরণ’ করা না হয়, সে বিষয়েও ঢাকাকে সতর্ক করেছে ভারতীয় প্রতিনিধিদল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে গ্রেফতার হলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। অর্থাৎ, তিনি দেশে ফিরলে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলেও তার নিরাপত্তা ও চিকিৎসার বিষয়টি যেন যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়—এমন বার্তাই দিয়েছে ভারত।
তবে শেখ হাসিনা কীভাবে বা কোন পথে বাংলাদেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগ এখনো কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেনি বলে ভারতীয় গোয়েন্দাদের ধারণা।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার কয়েকজন সন্দেহভাজন সদস্যের উপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দারা উদ্বিগ্ন। প্রতিবেদনে এমন ছয়জনের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন অতীতে কাশ্মীরে সক্রিয় ছিলেন বলে ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
তারা কী কারণে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড কী—এসব বিষয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকি বোঝাতে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও টেনে আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মূলত সাবেক কোনো রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার একটি উদাহরণ হিসেবে বেনজির ভুট্টোর ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটেই এ প্রসঙ্গটি তুলে ধরা হয়েছে।
জেবি




