রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আ.লীগ প্রশ্নে দিল্লির মনোভাব কি পাল্টাচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

আ.লীগ প্রশ্নে দিল্লির মনোভাব কি পাল্টাচ্ছে?
আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ছবি: সংগৃহীত

শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে নয়া দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতাদের অংশগ্রহণে নির্ধারিত একটি সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এতে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে দিল্লির মনোভাবে কি কোনো পরিবর্তন আসছে?

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদসহ দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অংশগ্রহণে শনিবার (২৯ আগস্ট) নয়া দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় (এফসিসি) ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’ শীর্ষক সেমিনারটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ আগে দিল্লি পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় তা বাতিল করেন আয়োজকরা।

বিষয়টি নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফসিসির সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ নন্দ জানিয়েছেন, পুলিশ শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি নেই বলে জানিয়েছে; তবে কেন অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

দিল্লি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানায়, কোনো অনুষ্ঠানে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকলে পুলিশ সেটি বাতিল করার অধিকার রাখে। তবে এই নির্দিষ্ট সেমিনারে এমন আশঙ্কা ছিল কি না, তা পুলিশ স্পষ্ট করেনি।

এফসিসি ও বেলজিয়ামভিত্তিক ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ আয়োজনে সেমিনারটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। আয়োজকদের প্রচারপত্রে বক্তা ও আলোচক হিসেবে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মী নূরান নবী, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলমসহ কয়েকজনের নাম ছিল। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ এবং চেক রাজনীতিবিদ ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ওন্দ্রেজ দোস্তালের মতো ব্যক্তিরাও আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

আরও পড়ুন

দিল্লিতে সেমিনারের অনুমতি পেলেন না আ.লীগ-সংশ্লিষ্টরা!

সেমিনারটি বাতিলের ঘটনাকে আলাদা করে দেখছেন না বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। কারণ, এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে একই এফসিসিতে শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। গত ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়া দিল্লির এফসিসি কার্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে অডিও লিংকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম।

Delhi
শেষ মুহূর্তে বাতিল হয় অনুষ্ঠানটি। ছবি: সংগৃহীত

হাসিনাকে দিল্লিতে বসে এভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ওই ঘটনার পর ঢাকা-নয়া দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।

বিবিসি বাংলার দিল্লি সংবাদদাতা শুভজ্যোতি ঘোষের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেই অভিজ্ঞতার পর দিল্লি আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠান করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারে। বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউও মনে করছেন, হাসিনার বক্তব্যের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ককে নতুন করে অস্বস্তিকর অবস্থায় নেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে না ভারত। অর্থাৎ, এবারের সেমিনার বাতিলকে অনেকে ঢাকার উদ্বেগকে দিল্লির পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

দিল্লির অবস্থানে কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ায় ঢাকা-নয়া দিল্লি সম্পর্কে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। এরপর থেকেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার বক্তব্য দেওয়া বাংলাদেশের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে ওঠে। ঢাকার পক্ষ থেকে একাধিকবার এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ঢাকাকে ‘নতুন বার্তা’ জয়শঙ্করের

এ অবস্থায় ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে হাসিনার বক্তব্য এবং তার কয়েক সপ্তাহ পর আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতাদের অংশগ্রহণে আরেকটি অনুষ্ঠান বাতিল—দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে দিল্লির অবস্থানে অন্তত কৌশলগত সতর্কতার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর রাখার প্রয়োজনীয়তা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলোতে ঢাকা-নয়া দিল্লির সহযোগিতা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা-সংশ্লিষ্ট প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করুক—দিল্লি হয়তো তা এড়াতে চাইছে।

Hasina
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বড় বাধা শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সাবেক কূটনীতিক মাহফুজুর রহমানের মতে, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্য ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছিল। এবারের ঘটনা বাংলাদেশের উদ্বেগকে ভারত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে—এমন একটি ‘পজিটিভ সিগন্যাল’ হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ সরাসরি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল করেছে—এমন কথা বলেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কা থাকলে যেকোনো অনুষ্ঠান বাতিল করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। ফলে অনুষ্ঠান বাতিলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।

আরও পড়ুন

হাসিনাকে ফেরত পাঠানো নিয়ে ভারতের ভিন্ন সুর!

তবু ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুটি কারণে—প্রথমত, অনুষ্ঠানটির বক্তাদের তালিকায় আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম ছিল; দ্বিতীয়ত, এর আগে একই এফসিসিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে প্রকাশ্য অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের অবস্থান এখনো পুরোপুরি অপরিবর্তিত কি না, সেটি স্পষ্ট নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, ভারত অন্তত আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে কি না—সেই প্রশ্ন এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

একদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকার কঠোর প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণে পরবর্তী একটি সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল—এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় দিল্লির নতুন হিসাব-নিকাশের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর