বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে একদিকে আনন্দ ও গর্ব, অন্যদিকে দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারবেন কি না—এ নিয়ে ভয় ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমার মধ্যে দুটি অনুভূতি আছে। একটা হচ্ছে একটু গর্ব হয় যে আমাকে এই পথ দেওয়া হয়েছে। আমি যদিও এটার যোগ্য নই, এর জন্য আমার আনন্দ হয়। আবার ভয়ও হয় যে আমি এটা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারব কি না। এই বোধটাও সবসময় কাজ করছে।’
নতুন দায়িত্বকে নিজের জন্য সম্মানের পাশাপাশি বড় ধরনের দায়িত্ব হিসেবেও দেখছেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তা যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন কি না, সেই ভাবনাও সবসময় তার মধ্যে কাজ করছে। আমার সঙ্গে যারা রয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই ইতোমধ্যে তাকে সহযোগিতা করেছেন। সামনের দিনগুলোতেও তাদের সহযোগিতা নিয়েই অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করতে চাই।
রিজভী বলেন, ‘আমার যারা এখানে সহকর্মীরা রয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেরই সমর্থন নিয়ে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে তারা ইতিমধ্যে সহযোগিতা করেছেন। আমার সঙ্গে যারা এখানে রয়েছেন প্রত্যেকেই সহযোগিতা করেছেন। আমি আশা করি তাদের সহযোগিতা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আমার ওপর অর্পিত যে দায়িত্ব আসবে, আমাদের যে দায়িত্বগুলো দেওয়া হবে, যে কাজগুলো করতে হবে, সেটা যাতে সুচারুভাবে করতে পারি—সেটাই হচ্ছে আমার মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় ভয়।’
তিনি বলেন, ‘দায়িত্বটি যেন সঠিকভাবে পালন করতে পারি, সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। বলতে পারেন এটা একটা অনুভূতি। আমি ওইটা ঠিকমতো পালন করার চেষ্টা করব। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে সাহস ও শক্তি দেন।’
এদিকে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন রিজভী। তিনি জানান, বিএনপির চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও শনিবার এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগে শুধু শনিবার এসব বৈঠক হলেও এখন বৃহস্পতিবারও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তৃণমূলের ইউনিটগুলো বসে একজন প্রার্থী নির্ধারণ করবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা জেলা পর্যায়ের সহযোগিতা নিয়ে প্রার্থী বাছাই করবেন। এরপর দলের পক্ষ থেকে একজনকে সমর্থন দেওয়া হবে। একই পদে একাধিক প্রার্থী যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেন, সে বিষয়ে তৃণমূল নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে একজন প্রার্থীকে দল সমর্থন করবে—এমন বার্তা তৃণমূল নেতাদের দেওয়া হয়েছে বলে জানান রিজভী। দলীয় সিদ্ধান্ত অতিক্রম করে একাধিক প্রার্থী হলে তা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হবে।
রিজভী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামীতে যখনই নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করবে, সেই ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী যাতে তৃণমূলে, বিশেষ করে ইউপি চেয়ারম্যান পদে একজন প্রার্থী হয়, একজনকেই দল সমর্থন করবে। সেখানে যাতে কেউ সেটিকে অতিক্রম করে অথবা সেই নিয়ম বা শৃঙ্খলা ভেঙে একাধিক প্রার্থী না হয়, সেই ব্যাপারে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিও বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ের নেতাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কর্মকাণ্ড করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, জেলা থেকে উপজেলা এবং উপজেলা থেকে পৌরসভা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবসহ উপস্থিত নেতাদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলা কোনোভাবেই ভঙ্গ করা যাবে না। দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না।
বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরার বিষয়েও তৃণমূল নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান রিজভী।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দেশের মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কর্মসূচির বিষয়ে জনগণকে জানানো এবং সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা দলের নেতাকর্মীদের অন্যতম দায়িত্ব।
রিজভী বলেন, দল সুসংগঠিত থাকলে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় থাকলে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি যথাযথভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে। নেতাকর্মীরা যদি সচেতনভাবে সরকারের কার্যক্রম জনগণকে না জানান, তাহলে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষ যথাযথভাবে জানতে পারবেন না।
তিনি সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য ভাতা, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং খাল খননের মতো কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, এরই মধ্যে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন করা হয়েছে। একইভাবে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি গাছ লাগানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ধরনের কর্মসূচির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে নেতাকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের অনুভূতির বিষয়ে বলতে গিয়ে রিজভী আবারও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এত বড় দায়িত্ব পাওয়া তার জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করতে পারার বিষয়টিও তার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি না এ দায়িত্বের আমি পুরোপুরি যোগ্য। তবে দল যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটিকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছি এবং দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
সহকর্মীদের সহযোগিতার ওপর আস্থা রেখে তিনি বলেন, একা কোনো দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। দলের নেতাকর্মী ও সহকর্মীদের সম্মিলিত সহযোগিতা এবং সমর্থন নিয়েই তিনি সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
এএইচ/এআরএম




