শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জুলাই জাদুঘরে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস দেখতে চাই না: নাহিদ ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

শেয়ার করুন:

জুলাই জাদুঘরে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস দেখতে চাই না: নাহিদ ইসলাম
কথা বলছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। ছবি: ঢাকা মেইল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক বয়ানে পরিণত না করে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘরকে জাতীয় ইতিহাস চর্চার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখানে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস দেখতে চাই না।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর গণভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের কিছু অংশ অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পরিচিত কিছু মুখ ও ঘটনার উপস্থিতি বারবার এসেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের বিস্তৃত পরিসর, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ সেভাবে উঠে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে সময়ের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের ঘটনাগুলো সাজানো প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার আন্দোলনের ঘটনাগুলোও আলাদাভাবে তুলে ধরা উচিত। এসব জায়গাতেও নির্যাতন, প্রতিরোধ ও মানুষের অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে কোনো ধরনের দলীয় ইতিহাস দেখতে চাই না। এটা প্রকৃত ইতিহাস চর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের একটি কেন্দ্র হওয়া উচিত। অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যেন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস এমনভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করতে হবে, যাতে দেশের সবাই সেটিকে নিজেদের ইতিহাস হিসেবে ধারণ করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রকৃত সত্য যেন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে পরিবর্তিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।’

জাদুঘরের বর্তমান কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল বর্তমানে নেই। প্রায় ২০০ জনের মতো জনবল প্রয়োজন হলেও এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন কাজ করছেন। স্বল্প জনবল দিয়ে আপাতত স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে জাদুঘরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দর্শনার্থীদের সঠিকভাবে জাদুঘরের বিভিন্ন নিদর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে প্রশিক্ষিত জনবলও প্রয়োজন।’

জাদুঘর পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ ও জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘জাদুঘরটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামো তৈরি করা দরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন শিক্ষার্থী, গবেষক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শুরু থেকেই যারা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো উচিত। গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে জাদুঘর পরিচালনা করা প্রয়োজন।’

জাদুঘরে শহীদ আবু সাঈদের উপস্থিতি নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তার ছবি বর্তমানে প্রদর্শনীতে না থাকার বিষয়টি তারা জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেটি জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।’

শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন আরও বেশি পরিমাণে প্রদর্শনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শহীদদের পরিবারের কাছ থেকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ যে বিপুলসংখ্যক স্মৃতিচিহ্ন পেয়েছে, তার একটি অংশ বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে। আরও অনেক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, যেগুলো শৈল্পিকভাবে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

গণভবনের পুরো ১৭ একর জায়গাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জাদুঘরের পরিসর আরও বাড়িয়ে বিভিন্ন ঘটনা, স্মৃতি ও নিদর্শনকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সীমান্ত হত্যা, ভারতবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি সরিয়ে ফেলার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন। নাহিদ ইসলাম, ইতিহাসের অংশ হিসেবে এসব ঘটনাও যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা উচিত। বিগত ১৬ বছরে দেশের ওপর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পাশাপাশি মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের ইতিহাসও জাদুঘরে তুলে ধরতে হবে। কোনো ঘটনা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের একক সম্পত্তি নয়। এটি মানুষের আন্দোলন ও বিজয়ের ইতিহাস। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব থেকেই জাদুঘরকে একটি নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও জাতীয় ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।’

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর